default-image

দুই চোখে ব্যান্ডেজ, হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত প্লাস্টার আর কাঁধে ধারালো অস্ত্রের কোপ নিয়ে কাতরাচ্ছেন মো. সাইফুল ইসলাম (২৪)। শুক্রবার উপস্থিতি টের পেয়ে অসহিষ্ণু গলায় বললেন, সাংবাদিক কেন এসেছে? কী লাভ?

বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সাইফুল জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে এসেছেন। চিকিৎসকেরা বলে দিয়েছেন, তাঁর দৃষ্টি আর ফিরবে না। সাইফুলের বাবা মো. নুরুল ইসলামের অভিযোগ, ২৩ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ছেলে হামলার শিকার হওয়ার পর তিনি থানায় ছুটে গিয়েছিলেন। মামলা দূরে থাক, সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করতে পারেননি।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে কথা হয় নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, হামলাকারীরা প্রভাবশালী। সম্পর্কে সবাই তাঁদের আত্মীয়স্বজন। জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। রাজনৈতিক আদর্শও আলাদা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আশ্রয়–প্রশ্রয়ে থাকার কারণে মামলা নেয়নি পুলিশ।

নুরুল ইসলাম বলেন, তাঁদের আত্মীয় ইউনুস, ইলিয়াস ও আবু বকর একবার মেজ ছেলেকে মেরেছিল। তখন ছোট ছেলে সাইফুল প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেন। পরে আবারও দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি লেগেছিল। একপর্যায়ে টিনের ওপর পড়ে বিরোধীপক্ষের একজনের হাত কেটে যায়। তখন থেকেই তারা হামলার পরিকল্পনা করছিল।

বিজ্ঞাপন

নুরুল আরও বলেন, ওই দল টোপ হিসেবে সাইফুলের বন্ধু রমজানকে ব্যবহার করেছিল। ঘটনার রাতে রসের পিঠা খাওয়ানোর কথা বলে রমজান সাইফুলকে ডেকে নিয়ে যান। কয়েকবার পিঠা মুখে দেওয়ার পরই পেছন থেকে কোপ দেয় কেউ। সাইফুল দেখেন, রমজানদের ঘরে জনা দশেক লোক। ছুটে বেরিয়ে আসেন সাইফুল। পিঠ থেকে রক্ত গড়াচ্ছিল। হঠাৎ কিছুতে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান। ১০-১২ জন লোক প্রথমে তাঁর হাত পিছমোড়া করে বাঁধে, মুখে গামছা গুঁজে দেয়, চোখ বেঁধে ফেলে।

তখনই তাঁর চোখ খুঁচিয়ে নষ্ট করে দেওয়া হয়। ওই অবস্থায় কতক্ষণ ছিলেন, সাইফুল জানেন না। ফজরের আজানের পর এলাকার লোকজন সাইফুলকে মাঠের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখেন। সেখান থেকে তাঁকে শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।
নুরুল বলেন, ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে ২ নম্বর খোন্তাকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন খানের ফোনে ছেলের অবস্থা জানতে পারেন তিনি। তখনই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইদুর রহমানকে ফোন করে থানায় গিয়ে দেখেন, তিনি নেই, পরিদর্শক (তদন্ত) আছেন। তাঁরা দ্রুত সাইফুলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। পুলিশ অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে দেয়।

ছেলেকে উদ্ধৃত করে নুরুল ঘটনায় যুক্ত কয়েকজনের নাম বলেছেন, তাঁরা হলেন মামুন মোল্লা, মাসুদ মোল্লা, ইউনুস, ইলিয়াস, আবু বকর, রাজ্জাক ও শিপন। অন্যরা মুখোশ পরে ছিলেন। নুরুল বলেন, তাঁদের সবাই চেয়ারম্যান মহিউদ্দীনের লোক।
মহিউদ্দীন খান বলেন, চেয়ারম্যান হিসেবে সবাই তাঁর লোক। কে বা কারা এই ঘটনায় দায়ী, তিনি বলতে পারবেন না। কিন্তু সাইফুলের ঘটনায় এলাকার মানুষ স্বস্তি পেয়েছে। সাইফুল এলাকার সবচেয়ে দুর্ধর্ষ লোক। মামুন মোল্লা বলেন, সাইফুলদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ নেই। কয়েক দিন আগে তাঁর বাসার সামনে ছিনতাই করেন সাইফুল। ওই মামলার ১ নম্বর সাক্ষী মামুন। আদালতে হাজিরা না দেওয়ার জন্য তাঁদের চাপ দিচ্ছিল সাইফুলের পরিবার।

শরণখোলা থানার ওসি সাইদুর রহমান বলেন, সাইফুলের বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মারামারি, মাদক, শ্লীলতাহানিসহ নানা অপরাধের ৩৬টি মামলা আছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য সাইফুলকে খুলনায় নিতে বলা হয়েছিল। তখনো পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। পরে পুলিশই অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে সাইফুলের বাবাকে কিছু টাকা দিয়ে খুলনায় পাঠায়। পুলিশ মামলা নেওয়ার জন্য বসে আছে। মামলা হলে তারা তদন্ত করে দেখবে।

অন্যদিকে নুরুল ইসলাম বলছেন, তাঁকে যেকোনো উপায়ে শরণখোলা থেকে সরানোর ছক কেটেছিল পুলিশ। তাঁর কথায়, ‘আমি তাঁদের বললাম, জানি, আপনারা মামলা নেবেন না, আপনাদের অসুবিধা আছে। সাধারণ ডায়েরি করার অধিকার তো আমার আছে।’

চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, সাইফুল আর দেখতে পাবেন বলে মনে হয় না। দুই চোখে সংক্রমণ হয়ে গেছে। মেডিকেল বোর্ড সংক্রমণ কমাতে ওষুধ দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন