default-image

রংপুর নগরের ঘাঘট নদে থেমে নেই মাটি কাটা। শীত মৌসুম এলেই মাটিখেকোরা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে এই নদে। এ যাত্রায় উত্তম এলাকায় মাটি কাটার ধুম পড়েছে। প্রায় শুকনা নদের মাঝে আড়াআড়ি অস্থায়ী রাস্তা দিয়ে চলছে অবাধে মাটি কাটা। এই রাস্তার কারণে নদের পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর আগে চলতি মাসের গোড়ার দিকে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে সিটি করপোরেশন এলাকায় দমদমা সেতুর ৫০০ গজ দূরে এই নদে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছিল। তখন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ ছাপা হলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়ে যায়।
উত্তম এলাকায় মাটি কাটার সঙ্গে স্থানীয় বালু ও মাটির ব্যবসায়ী লাল মিয়া জড়িত। তিনি এক সপ্তাহর বেশি সময় ধরে নদ থেকে মাটি কেটে নিলেও সেদিকে প্রশাসনের কোনো নজর নেই। এমনকি মাটি কাটা বন্ধে স্থানীয় কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম গ্রাম পুলিশ নিয়ে উদ্যোগী হলেও কাজে আসেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘাঘট নদ থেকে এভাবে মাটি বা বালু উত্তোলনের দৃশ্য নতুন কিছু নয়। শুকনা মৌসুম এলেই নদীখেকোরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি হলে কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর আবার তা শুরু হয়।
গত বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তম হাজীপাড়া গ্রামে ঘাঘট নদের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে মাটি কাটা চলছে। মাটি ও বালু ফেলে নদের মধ্যে আড়াআড়ি প্রায় ১০০ ফুট প্রশস্ত একটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। সেই রাস্তা দিয়ে মাটি ট্রাক ও ট্রলিতে করে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আড়াআড়ি রাস্তায় পানিপ্রবাহের জন্য ছোট একটি লাইন রাখা হয়েছে। কিন্তু তাতেও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদের দক্ষিণ দিক থেকে এ মাটি কাটা চলছে।
এদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় ছয়টি ট্রলি ও ট্রাকে করে মাটি নিয়ে যেতে দেখা গেছে। এভাবে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ৩০ থেকে ৩৫টি ট্রাক বা ট্রলিতে করে মাটি নিয়ে যাওয়া হয় বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান। গতকাল শুক্রবারও মাটি কাটা হয়েছে।
নদের মাটি কাটায় পাড় ভেঙে যাচ্ছে। এ কারণে হুমকির মুখে পড়েছে পাশের আবাদি জমি। ইতিমধ্যে কারও কারও জমি ভেঙেও গেছে।
হাজিপাড়ার কৃষক সেকেন্দার আলীর নদের পাশে ৬৫ শতাংশ আবাদি জমি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘নদের ভাঙন থাকি জমি রক্ষা করার জন্যে গত বছর এই এলাকাত বাঁশের খুঁটি দিছনো। এমন করিয়া মাটি-বালু কাটি নিয়া যাওয়ায় পানি পাক খায়, নদ ভাঙি যায়। গত এক বছরে হামার প্রায় ১৫ শতাংশ জমি ভাঙি গেইছে।’
আরেক কৃষক জয়নাল হোসেনেরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জমি নদে ভেঙে গেছে। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আরও কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মতলুবার রহমান, আবু হোসেন, মোসলেম উদ্দিন, বুলু মিয়া ও জিয়াউর রহমান।
মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত লাল মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাপ-চাচার কিছু জমি ভেঙে নদে বিলীন হয়েছে। সেই স্থান থেকেই এসব মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ নদের মধ্যে রাস্তা করার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এখন তো নদীত তেমন পানি নাই। সেই জন্যে দিছি। মাটি কাটা শেষ হইলে এই বাঁধ কাটি দেওয়া হইবে।’
যোগাযোগ করলে সদর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার ফাউজুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘এভাবে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার খবর আমাদের জানা নেই। এখন জানলাম। অবশ্যই তা বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’
২০১০ সালের বালুমহাল আইনে বলা আছে, বিপণনের উদ্দেশ্যে কোনো উন্মুক্ত স্থান, চা-বাগানের ছড়া বা নদীর তলদেশ থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না। এ ছাড়া সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বেসরকারি স্থাপনা অথবা আবাসিক এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু ও মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0