খাদ্য অধিদপ্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৯৫ জনকে চাকরি দেওয়ার প্রায় চার বছর পর তাঁদের সনদের যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগের আগে সনদ যাচাই না করায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৯৫ জনের কাগজপত্রের মধ্যে ৩২ জনের সনদই পায়নি মন্ত্রণালয়। ১৪ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদের বদলে পাঠানো হয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, জেলা প্রশাসকের সনদ, প্রশংসাপত্র, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও এম এ জি ওসমানীর দেওয়া চিঠি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য অধিদপ্তরে ২০১০ সালে খাদ্য পরিদর্শক, উপখাদ্য পরিদর্শক ও সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শকসহ ১০ ক্যাটাগরিতে জনবল নিয়োগ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো অনেকের মুক্তিযোদ্ধা সনদই সঠিক নয় বলে প্রাথমিক যাচাইয়ে মনে হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ দেওয়ার চার বছর পর হঠাৎ করে গত বছরের ১২ নভেম্বর সবার সনদ যাচাইয়ের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, ২০১০ সালের এই নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় নীতিমালা অনুযায়ী ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান বা পোষ্য কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ সঠিক কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। চিঠিতে সই করেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এস এম আনছারুজ্জামান।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চিঠিতে ২৯৫ জনের সনদ যাচাই করতে বললেও খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২৬৩টি সনদ পাঠানো হয়। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সনদ ২৫৬টি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরিত সনদ পাঁচটি, মো. আতাউল গনি ওসমানীর দুটি সনদ। এ ছাড়া কিছু সনদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার জাতীয় পরিচয়পত্র, মুক্তিবার্তা নম্বর, গেজেট নম্বর (সত্যায়িত ফটোকপি, প্রমাণ) সংযুক্ত করে না পাঠানোর কারণে এগুলোর যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৭ ডিসেম্বর এসব সনদ সঠিকভাবে যাচাইয়ের জন্য তাদের দেওয়া ছক অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তথ্য লিপিবদ্ধ ও সংযুক্ত করে পাঠাতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এম এ জি ওসমানীর সনদকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ হিসেবে মূল্যায়ন করে না। কারণ, ওসমানীর স্বাক্ষর করা সাদা কাগজ ফটোকপি করে অনেক জালিয়াতি হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে।
জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেকগুলো সনদে থাকা স্বাক্ষর ও ধরন দেখে জাল মনে হয়েছে। আমরা এগুলো আবার যাচাই করব। সনদগুলো যাচাই না করে কেন এঁদের চাকরি হলো বা কীভাবে হলো, তা বুঝতে পারছি না। আমরা তাদের ছক পাঠিয়েছি। দেখি, ছক অনুযায়ী তারা কী পাঠায়।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক পদে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়া যশোরের কনিকা রানী মণ্ডলের দেওয়া সনদ যাচাইয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে তাঁর মাধ্যমিক পাসের সনদ। একই পদে চুয়াডাঙ্গার আবদুস সালামের সনদ যাচাইয়ে পাঠানো জেলা প্রশাসকের সনদে তাঁর বাবা মোতালেব আলীকে বলা হয়েছে জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা। উপখাদ্য পরিদর্শক সাকির আহম্মেদ খানের জন্য পাঠানো হয়েছে তাঁর বাবাকে দেওয়া মৌলভীবাজারের সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপকের প্রত্যয়নপত্র। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইংরেজি গ্রামার কোর্সের সনদ রয়েছে উপখাদ্য পরিদর্শক সিলেটের রাফিয়া আক্তার চৌধুরীর। প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশংসাপত্র, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার প্রশংসাপত্র পাঠানো হয়েছে সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক পটুয়াখালীর আবদুর রশিদের ক্ষেত্রে। ওসমানীর স্বাক্ষর করা সনদ রয়েছে উপখাদ্য পরিদশর্ক পটুয়াখালীর মঞ্জুরুল আহসানের ক্ষেত্রে। একই পদের রাজশাহীর ফরিদ্যু কুমার দাসেরও একই রকম সনদ।
রয়েল পাকিস্তান লেখা অস্পস্ট প্যাডের সনদ পাঠানো হয়েছে সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক নড়াইলের শেখ এজাজ আহমেদের ক্ষেত্রে। উপখাদ্য পরিদর্শক যশোরের এস এম আনিসুর রহমানের বিপরীতে রয়েছে ‘গভর্নমেন্ট অব বেঙ্গল’ লেখা একটি রসিদ। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রত্যয়নপত্র রয়েছে একই পদের নারায়ণগঞ্জের সাজোয়ার রহমান ভূইয়া, সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক কিশোরগঞ্জের বেলায়েত হোসেন, রংপুরের মেহেদী হাসান, ময়মনসিংহের আবদুস সাদেকের ক্ষেত্রে। মন্ত্রণালয়ে সনদের জন্য আবেদন করেছেন এবং সাময়িক সনদ পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়াধীন—এমন প্রত্যয়নপত্র রয়েছে সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক কুমিল্লার রৌশন আলমের। মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো তাঁর বাবার নামের ঘরে উল্লেখ রয়েছে মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার...। কিন্তু নাম নেই। তবে প্রত্যয়নপত্রে নাম উল্লেখ রয়েছে কেরামত আলী।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খাদ্য অধিদপ্তরের এই নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অনিয়মের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট সাতজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আদালতে রিট করেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আদালত ওই সাতজনকে নিয়োগের নির্দেশ দেন। ২০১৩ সালে খাদ্য অধিদপ্তরে অরেকটি নিয়োগ-প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১০ সালে যোগ্য হয়েও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ না পাওয়া কয়েকজন ওই নিয়োগ স্থগিতের জন্য আদালতে যান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সাতটি পদ শূন্য রেখে নিয়োগের নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশ মানা হয়নি। গত বছরের ৭ জুলাই খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খাদ্যসচিবকে এই সাতজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য অনুমোদন চেয়ে চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, যাচাইয়ে সনদ সঠিক প্রমাণিত না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপরই শুরু হয় ২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সনদ যাচাইয়ের প্রক্রিয়া।
ভুক্তভোগী ও চাকরি না পাওয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় নিয়োগের সময় সনদ জমা ও যাচাই করার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও সনদ জমা নেওয়া ছাড়াই বা ভুয়া সনদ দেওয়া ব্যক্তিদের ঘুষের বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় চাকরি দেওয়া হয়েছে। সাধারণ কোটার প্রার্থীদেরও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আরেকজন ভুক্তভোগী গাজী মো. শাফিকুল বলেন, ‘আমরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। আমরা যোগ্যতা ও কোটা অনুযায়ী চাকরি চাই। আদালতের নির্দেশের পরও আমাদের চাকরি না দিয়ে অন্যদের মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি দেওয়া হয়েছে।’
জানতে চাইলে খাদ্যসচিব বেগম মুশফেকা আকফাৎ বলেন, ‘এ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আমরা খাদ্য অধিদপ্তরকে পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। বলেছি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যেভাবে তালিকা দিয়েছে, সেভাবেই যেন তারা ছকে তথ্য দেয়। কারও সনদ ভুয়া প্রমাণিত হলে তাঁর চাকরি চলে যাবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0