default-image

হাতি বিচরণের অন্যতম নিবিড় এলাকা চুনতি অভয়ারণ্যের প্রায় পাঁচ একর জায়গা দখলদারদের কবলে চলে গেছে। গত পাঁচ বছরে সেখানে গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতি। অভয়ারণ্যের মধ্যে কয়েক শ ঘর তোলা হয়েছে। ছোট ছোট এসব ঘর বিক্রি করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের কাছে। অবৈধ এসব ঘর উচ্ছেদ করতে গিয়ে গত দুই বছরে বেশ কয়েকবার হামলার শিকার হয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
অভিযোগ উঠেছে, কক্সবাজারের চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের যুবলীগের ‘নেতা’ তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে অভয়ারণ্যের জায়গা দখল, রোহিঙ্গা বসতি স্থাপন এবং গাছ কাটা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে গত পাঁচ বছরে বন বিভাগ বন আইনে ৬১টি মামলা করেছে। অভয়ারণ্যের চকরিয়া অংশের কলাতলী এলাকায় (আজিজনগর বিটের আওতাধীন) তাঁর নামে গড়ে তোলা হয়েছে ‘তোফায়েল পাড়া’। সেখানে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি তিন শতাধিক অবৈধ ঘর তুলেছেন বলে জানান বন কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ৫০টি ঘর একাই তুলেছেন তোফায়েল। প্রতিটি ঘর তিনি ১ থেকে ২ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। তাঁর কাছ থেকে ঘর কেনার কথা স্বীকার করেছেন কয়েকজন রোহিঙ্গা।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও কক্সবাজারের চকরিয়ার ১৯ হাজার ১৭৭ একর ভূমিতে গড়ে উঠেছে চুনতি অভয়ারণ্য। নরম মাটি, ঝরনা ও ভূগর্ভস্থ পানিপ্রবাহের কারণে এই অভয়ারণ্য এশিয়ার মধ্যে হাতির অন্যতম প্রজননক্ষেত্র হিসেবে সুপরিচিত। তবে অভয়ারণ্যের মধ্যে দিন দিন মানুষের বসতি বাড়তে থাকায় বিপদে পড়েছে বন্য প্রাণীরা। তারা এখন বনছাড়া হতে চলেছে। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. আখতার হোসেন বলেন, চুনতি অভয়ারণ্যে ৬৯১ প্রজাতির গাছ রয়েছে। তিনি বলেন, এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই অভয়ারণ্যে হাতি রয়েছে অন্তত ২৭টি, উভচর প্রাণী রয়েছে ২৬ প্রজাতির। ৫৪ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। এ ছাড়া ২৫২ প্রজাতির পাখি রয়েছে।

চুনতি অভয়ারণ্যের সহব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, লোহাগাড়া অংশের চুনতির প্রায় ২ হাজার ৫০০ একর, চকরিয়ার আজিজনগরে ১ হাজার একর, হারবাং এলাকায় ৫০০ একর এবং বাঁশখালী রেঞ্জ এলাকায় প্রায় ১ হাজার একর জায়গা দখল হয়ে গেছে। কমিটির সভাপতি মো. ইসমাইল বলেন, যেভাবে চুনতি অভয়ারণ্যে রোহিঙ্গাসহ অবৈধ বসতি গড়ে উঠছে, তা ভয়াবহ।

অভয়ারণ্যের কলাতলী এলাকায় ঘর কিনে বাস করছেন রোহিঙ্গা মো. ইসমাইল, নূরনাহার বেগম, আবদুল কাদের, মো. হাসান, সায়রা খাতুন, বেবী আক্তার, সৈয়দ নূর, আবুল কালাম, রেহেনা আক্তার ও বজল আহমদ। তাঁরা বলেন, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের এবং জায়গার মালিককে টাকা দিয়ে তাঁরা এখানে বসবাস করছেন।

চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তোফায়েল টাকা নিয়ে রোহিঙ্গাদের বনের মধ্যে বাড়ি করে দেন। অবৈধ দখল এবং বন কর্মকর্তাদের হামলার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বন আইনে ৬১টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় এক বছর কারাগারে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি জামিনে ছাড়া পান। এরপর ২ মে তিনি আবার অভয়ারণ্যের মধ্যে ঘর তোলার চেষ্টা করেন।

অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে তোফায়েল আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্ত্রী চারজন এবং পরিবারের সদস্য বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়ে তিনি অভয়ারণ্যের জায়গায় ঘর নির্মাণ করেছেন। তবে গাছ কাটার কথা তিনি অস্বীকার করেন। নিজেকে আজিজ নগর ওয়ার্ড যুবলীগের কাউন্সিলর দাবি করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা বন মামলাগুলো মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক।

অবশ্য চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতিমীরানুর ইসলাম বলেন, তোফায়েল আহমদ যুবলীগের কর্মী। তাঁর কাঠের ব্যবসা রয়েছে বলে শুনেছেন তিনি।

চুনতি অভয়ারণ্যের আওতাধীন আজিজ নগর এলাকার বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা আবদুর রউফ বলেন, বনের ভেতর কলাতলী, গাইনাকাটা, রোড পাড়া, ভিলেজার পাড়া, কোরবানিয়া ঘোনা, চেয়ারম্যান পাড়া, ছোবাইন্যার ঘোনা এলাকায় প্রায় ২০০ রোহিঙ্গা পরিবার বসবাস করে। তারা বনের ক্ষতি করছে, পাশাপাশি বিভিন্ন অপকর্মেও জড়াচ্ছে। এ ছাড়া চুনতি বিট এলাকার সুফীনগর, বার্মা পাড়া ও ল্যাঙ্গা হাসান পাড়াতেও রোহিঙ্গা বসতি রয়েছে। তিনি বলেন, গত বছরের নভেম্বর মাসে কলাতলী এলাকায় অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করতে গেলে রোহিঙ্গারা ধারালো ছুরি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে বন কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ করে।

অবৈধ বসতি উচ্ছেদের বিষয়ে চুনতি বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আবদুর রহমান বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফিজনূর রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা অবৈধভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। অবৈধ দখলদারদের আইনের আওতায় আনা হবে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন