ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে আর্থিক লেনদেন বেড়েছে। আবার কর্মসংস্থানের অভাব ও বেকারত্ব রয়েছে। এসব কারণে কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে যায়নি। তিনি বলেন, ঈদ সামনে রেখে ছিনতাইকারীরা যাতে বেপরোয়া হয়ে না উঠতে পারে, সে জন্য পুলিশ তৎপর আছে।

ঈদ সামনে রেখে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারে র‍্যাবও অভিযানে নেমেছে। ১২ এপ্রিল রাতে র‍্যাব রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ২০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে। বাহিনীটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল কে এম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ঈদ সামনে রেখে রাজধানীতে বিপণিবিতান ও বাজারকেন্দ্রিক কেনাকেটা বৃদ্ধি পাওয়ায় পথে–ঘাটে ছিনতাই বেড়েছে। র‍্যাব ইতিমধ্যে ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে।

ছিনতাই যে বেড়েছে, তা দেখা যায় পুলিশের পরিসংখ্যানেই। ডিএমপির হিসাব বলছে, গত ডিসেম্বরে রাজধানীতে ৬টি ছিনতাইয়ের (দস্যুতাসহ) ঘটনা ঘটে। জানুয়ারি মাসে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫। ফেব্রুয়ারিতে ১৯টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। মার্চের হিসাব পাওয়া যায়নি।

অবশ্য পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিএমপি যে হিসাব দেখায়, ছিনতাইয়ের প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী মামলার ঝামেলায় যেতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে থানা পুলিশ মামলা না নিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাকে কোনো মূল্যবানসামগ্রী ‘হারিয়ে যাওয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করে। এর উদ্দেশ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নথিপত্রে ভালো দেখানো।

কোথায় ছিনতাইকারী বেশি

ডিএমপির তালিকা অনুযায়ী, পুলিশের তেজগাঁও বিভাগে ছিনতাইকারী ও সমজাতীয় অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সংখ্যা বেশি (১২২ জন)। এর পরে রয়েছে রমনা, গুলশান, মিরপুর, উত্তরা, মতিঝিল, ওয়ারী ও লালবাগ বিভাগ।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকাভিত্তিক হিসেবে ছিনতাই বেশি হয় বাড্ডা, ভাটারা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায়। শাহবাগ, মগবাজার, রমনা, মালিবাগ রেলগেট, চানখাঁরপুল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা, গুলিস্তান, ধানমন্ডি, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড, নিউমার্কেট, পান্থপথ মোড় ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায়ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।

ডিএমপির তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, থানাভিত্তিক হিসাবে ছিনতাইকারীর সংখ্যা বেশি রাজধানীর ভাটারা, শাহবাগ ও শেরেবাংলা নগর থানায়—৩৪ জন করে। এরপর রয়েছে হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, তেজগাঁও, রমনা, হাতিরঝিল ও উত্তরা পশ্চিম থানা। ছিনতাইকারী কম রাজধানীর উত্তরখান, দক্ষিণখান ও উত্তরা পূর্ব থানায়। এই তিন থানায় তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা মাত্র ৬।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, রাজধানীতে ছিনতাইকারীরা এখন মূলত মধ্যরাত থেকে ভোরে ছিনতাইয়ে তৎপর থাকে। তারা ভোরে রিকশায় বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশন থেকে বাসামুখী অথবা বাসা থেকে স্টেশনমুখী যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন আড়তমুখী কাঁচামাল ও মাছ ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করেও তাঁরা ছিনতাইয়ে নামে। নির্জন অলিগলিতে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে পথচারীদের টাকাপয়সা কেড়ে নেয় কোনো কোনো ছিনতাইকারী চক্র।

এলাকাভেদে ছিনতাইয়ের ধরনে পার্থক্য আছে। যেমন পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানবন্দর সড়কে পুলিশ, ডিবিসহ (গোয়েন্দা পুলিশ) বিভিন্ন সংস্থার পরিচয়ে বেশির ভাগ ছিনতাই হয়। তারা রাস্তায় সাজানো তল্লাশিচৌকি (চেকপোস্ট) বসিয়ে বিদেশফেরত যাত্রীদের গাড়ি থামিয়ে সবকিছু ছিনিয়ে নেয়।

অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির তৎপরতা মূলত বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং রেলস্টেশন ঘিরে। পথে–ঘাটে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মুঠোফোন, ব্যাগ, স্বর্ণালংকার টান দিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় ‘টানা পার্টি’।

হোতা যাঁরা

রাজধানীর কোন এলাকায় কার নেতৃত্বে ছিনতাই হয়, তা–ও উল্লেখ করা হয়েছে ডিএমপির তালিকায়। যেমন মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা থেকে কাজীপাড়া হয়ে শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এলাকায় ছিনতাইয়ের নিয়ন্ত্রণ করেন মো. সবুজ (২৫)। মিরপুর ১০ (অরিজিনাল ১০), পূরবী সিনেমা হল ও মিরপুর ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সক্রিয় আরিফুল ইসলাম ও জুবায়ের হোসেন ওরফে রাসেলের নেতৃত্বাধীন চক্র।

পান্থপথ ও বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স এলাকায় সক্রিয় মো. সেন্টুর (৩৪) নেতৃত্বাধীন চক্র। সোনারগাঁও ক্রসিং এলাকায় ছিনতাই করে মো. তৌসিফ (২৪) নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন ছিনতাইকারীদের একটি দল। এ ছাড়া পান্থপথ মোড় থেকে গ্রিন রোড এলাকায় তারেক ওরফে সাগরের নেতৃত্বে ছিনতাই করা হয়। তিনি নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা বলে পরিচয় দেন।

ডিএমপির তালিকা অনুযায়ী, শাহবাগ এলাকায় মো. খোরশেদ আলম ও মো. ফেরদৌস, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় মিরাজ হোসেন, তোফাজ্জল, আলামিনসহ আটজন, গুলশান–১ নম্বরে শফিকুল ইসলাম, মো. আলম, ইসমাইল হোসেন, নূরে আলমসহ সাতজন, ভাটারায় মো. আরিফুর রহমান, মো. জিমানসহ ১১ জন, বাড্ডা ও আফতাবনগরে মো. দীন ইসলাম, মো. মুন্না, মো. মামুন, মো. সবুজসহ ১২ জন এবং ধানমন্ডি এলাকায় মো. সাব্বির শেখ, মকবুল হোসেন, ফালান সিকদারসহ মোট ১৪ জন ছিনতাই ও সমজাতীয় অপরাধ করে।

বিমানবন্দর ও আশপাশ এলাকায় ছিনতাইয়ে জড়িত মো. মাসুদ, হৃদয় হোসেন, মো. রাজীব, শাকিলসহ ২৬ জন। গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিনতাইয়ে সক্রিয় হৃদয় হাসান কালা চান ওরফে কালা ও শফিকুল ইসলাম ওরফে বিপ্লব।

ডিএমপির তালিকায় কয়েকজনের নামের পাশে মুঠোফোন নম্বরও উল্লেখ করা আছে। তাঁদের একজন আদাবরের শেখেরটেকের মো. সোহরাওয়ার্দী (২২)। ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন আর খারাপ ছেলেপেলেদের সঙ্গে মিশি না। ভালো হয়ে গেছি।’

ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে জায়গাগুলোকে নজরদারিতে রেখে নিয়মিত পুলিশি অভিযান চালাতে হবে।
নাইম আহমেদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার

বারবার অপরাধে

পুলিশ বলছে, ছিনতাইকারীরা ধরা পড়লেও বারবার জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে জড়ায়। যেমন কাজীপাড়ায় দন্তচিকিৎসক খুনের ঘটনায় রায়হান ওরফে সোহেল, রাসেল হাওলাদার, আরিয়ান খান হৃদয় ও সোলায়মান নামের চার ‘ছিনতাইকারী’কে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। পুলিশ জানিয়েছে, ছিনতাইয়ের অভিযোগে রায়হান ও রাসেলকে আগেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে ঘটনার কিছুদিন আগে জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন তাঁরা।

পুলিশের এ ধরনের তালিকাও নতুন কিছু নয়। ২০০৮ সালে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদ কার্যকরভাবে ছিনতাই প্রতিরোধের লক্ষ্যে ‘ছিনতাই প্রতিরোধ নির্দেশিকা’ বের করেছিলেন। ওই নির্দেশিকায় ডিএমপির তখনকার ৩৩ থানায় ৫৪৪টি জায়গা চিহ্নিত করা হয়, যেখানে ছিনতাই হতো।

তালিকা হলেও ছিনতাই কমছে না কেন—জানতে চাইলে সাবেক ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে জায়গাগুলোকে নজরদারিতে রেখে নিয়মিত পুলিশি অভিযান চালাতে হবে।

পরিবারে বিপর্যয়

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ছিনতাইয়ের মামলায় আসামি ধরা ও তাদের সাজা নিশ্চিত করতে পুলিশের তৎপরতা কম থাকে। যেসব ঘটনা খুব বেশি আলোচনায় আসে, সেগুলোয় আসামি ধরা পড়ে। দেখা যায়, তারা আবার জামিনে বেরিয়ে যায়।

ছিনতাইয়ের ঘটনা নিছক টাকাপয়সা বা মুঠোফোন খোয়া যাওয়া নয়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি হারান তাঁর সর্বস্ব। কারও কারও পরিবারে নেমে আসে বিপর্যয়।

যেমন দন্তচিকিৎসক আহমেদ মাহি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী শাম্মী আখতার শুধু স্বজনই হারাননি, দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে চরম সংকটেও পড়েছেন। গত রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একমাত্র উপার্জনকারী সদস্যকে হারালে একটি পরিবার যেভাবে চলার কথা, আমরা সেভাবেই আছি।’

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন