আবদুল আলিম ওরফে মুক্তার বাসা সিলেট নগরের বারুতখানা এলাকায়। গত ১৫ এপ্রিল বিকেল সাড়ে চারটার ঘটনা। হঠাৎ আলিমের বাসায় হাজির হন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়া। পুলিশ আসার খবর শোনে দ্রুত বাসায় যান আবদুল আলিমের ভাই এজাজ আহমেদ। তখন এজাজকে এসআই আকবর জানান, তাঁর ভাই আলিম মাদক বেচাকেনায় জড়িত। এ কথা বলেই আলিমকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ভাইকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনতে গেলে এসআই আকবর তাঁর কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আলিমের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে মামলা করে পুলিশ। আলিমকে ২১টি ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। তবে পরিবার বলছে, আলিমকে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে কোনো মাদকদ্রব্য ছিল না।

১০ অক্টোবর মধ্যরাতে রায়হান আহমেদ (৩৪) নামের এক যুবককে তুলে নিয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানাধীন বন্দরবাজার ফাঁড়িতে আটকে রাখা হয়। সেখানে নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ওই ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই আকবর হোসেন ভূইয়া। ঘটনার পরপরই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আকবরসহ ওই ফাঁড়ির চার সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। রায়হানের মৃত্যুর পর এসআই আকবরের আরও কিছু অপকর্ম সম্পর্কে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

এজাজ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আকবরের কিছু বিশ্বস্ত সোর্স ছিলেন। এই সোর্সরাই মাদক বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত। সোর্সরা প্রায়ই ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকাপয়সা আদায় করে আকবরসহ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিতেন। একইভাবে তাঁরা আমার ভাইকেও (আলিম) আটক করে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানোর পর বর্তমানে আমার ভাই জামিনে আছেন।’

আকবর হোসেনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে এখন সরব নগর পুলিশ এলাকা। ফাঁড়িতে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোপন একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একজন আকবরের কারণে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে।

আকবরের কর্মস্থলের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের বেড়তলা বগৈর গ্রামের আকবর হোসেন ভূইয়া ২০১৪ সালে পুলিশের কনস্টেবল পদে যোগ দেন। কনস্টেবল থেকে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ও পরে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে পদোন্নতি পান। এসআই হওয়ার পর থেকে তাঁর দাপট বাড়ে। কোতোয়ালি থানা থেকে ২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইনচার্জ) হিসেবে যোগ দেন। ওই সময় থেকে আকবর তাঁর ফাঁড়ি এলাকায় তৈরি করেন আলাদা এক জগৎ।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ আছে, তাঁকে দৈনিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাঁদা দিয়ে ফাঁড়ির আওতাভুক্ত বন্দরবাজার এবং আশপাশের এলাকার ফুটপাত ও প্রধান সড়ক অবৈধভাবে দখল করে ভ্রাম্যমাণ হকারেরা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। ফাঁড়ির অন্তর্ভুক্ত এলাকায় দুই হাজার ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী রয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন হকার আকবরকে ‘চাঁদা’ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত এক লাখ টাকা আকবর ‘চাঁদা’ আদায় করতেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোপন প্রতিবেদনেও ওঠে এসেছে এসব তথ্য।

বন্দরবাজার এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, আকবর প্রায়ই নিরীহ পথচারীদের আটকে টাকা দাবি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখালে ভুক্তভোগীরা টাকা দিয়ে ছাড়া পেতেন।

১০ অক্টোবর রাতে নগরের নেহারিপাড়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমেদকে আটক করে পরিবারের কাছে টাকা দাবি করেন আকবর। ওই রাতে রায়হান পুলিশের হেফাজতে মারা গেলে পরদিন এই মৃত্যুর ঘটনাটি ‘গণপিটুনি’ বলে গণমাধ্যমকর্মীদের ফোন করে জানিয়েছিলেন আকবর। পরে রায়হানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ঘটনাটি সাজানো বলে দাবি করে। রাতে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা হয়।
এরপর তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে রায়হান হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগের সত্যতা পায়। এরপরই আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। আকবর এখন গা–ঢাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগেও আকবরের বিরুদ্ধে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। আকবর তখন সিলেট কোতোয়ালি থানায় কর্মরত। গত বছরের ১৪ জানুয়ারি নগরের কাজলশাহ এলাকার ভাড়া বাসা থেকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) মেধাবী শিক্ষার্থী তাইফুর রহমানের (প্রতীক) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। তাইফুরের পরিবার তখন অভিযোগ করেছিল, তদন্ত কর্মকর্তা আকবর হত্যার ঘটনাকে ‘আত্মহত্যা’ বলে ধামাচাপা দিয়েছেন।
তাইফুরের বাড়ি নরসিংদী সদর উপজেলা ব্রাহ্মন্দী গ্রামে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি (জিইবি) বিভাগে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন তিনি। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ছিলেন।

তাইফুরের বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাওহিদা জাহান প্রথম আলোকে বলেন, তাইফুরকে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকে সুকৌশলে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছিলেন এসআই আকবর। সুরতহাল প্রতিবেদনে আকবর মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য লিখেছিলেন। আকবরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাইফুর হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নগর পুলিশের ভাবমূর্তি ও ভূমিকা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল, বিশেষ করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের ধর্ষণকাণ্ডের পর। ধর্ষণে জড়িতরা ছাত্রবাসে অনেক সময় ধরে থাকলেও তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। পরে প্রতিবাদের মুখে জেলা পুলিশ ও র‌্যাব তাঁদের একে একে গ্রেপ্তার করে। তিনি মনে করেন, নগর পুলিশকে জনবান্ধব করতে হলে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বদলানো দরকার। কেননা, এসআই পদের একজন আকবর তো আর ঊর্ধ্বতনদের না জানিয়ে কিছু করতে পারেন না।

মন্তব্য পড়ুন 0