default-image

দেশের উত্তরাঞ্চলের পর টাঙ্গাইল জেলায় একসময় শক্ত আস্তানা গেড়েছিল জেএমবি। দেশে বিভিন্ন সময় জঙ্গি হামলার ঘটনাতেও এই জেলার জঙ্গিদের নাম উঠে এসেছে। কিন্তু নিষিদ্ধঘোষিত এই সংগঠন সম্পর্কে কোনো তথ্যভান্ডার নেই টাঙ্গাইলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।
টাঙ্গাইলের গোপালপুরে গত শনিবার দরজি নিখিল চন্দ্র জোয়ার্দারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তাই বেকায়দায় পড়েছে পুলিশ। এ জেলায় জেএমবির বর্তমান কী অবস্থা, কারা এই জেলার সংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া এই সংগঠনের সদস্যদের কতজন কারাগারে আছেন, কতজন জামিনে রয়েছেন, এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্যভান্ডার নেই এখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনী ও সংস্থাগুলোর কাছে। ফলে নিখিল হত্যায় জেএমবি জড়িত বলে সন্দেহ করা হলেও একপ্রকার অন্ধকারে হাতড়াতে হচ্ছে পুলিশকে।
এর মধ্যে টাঙ্গাইলের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানায়, তাদের জানামতে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবির সদস্যদের মধ্যে ১১ জন মুক্ত রয়েছেন। এর মধ্যে কালিহাতী এলাকার পাঁচজন, মধুপুরের একজন এবং টাঙ্গাইল সদরের পাঁচজন। তবে গ্রেপ্তারের কোনো হিসাব নেই পিবিআইয়ের কাছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীর প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৫ সালের পর এই এলাকায় জেএমবির প্রকাশ্য কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। তাই সংগঠনটি সম্পর্কে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
১৯৯৮ সালে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ—জেএমবির জন্মের পর থেকে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে বোমা হামলার আগ পর্যন্ত টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলা ছিল জেএমবির একটা বড় ঘাঁটি। জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেলদুয়ারে সংগঠনটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ২০০৩-০৪ সালের দিকে বারপাখীয়া হাইস্কুলে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো বলে পরবর্তী সময়ে খবর বের হয়েছিল। কিন্তু এই উপজেলায় এখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কেও কোনো তথ্য নেই কোনো সংস্থার কাছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, গাজীপুর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় সব জঙ্গি হামলার সঙ্গে টাঙ্গাইলের জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে এসেছে। গত বছর ডিসেম্বরে চট্টগ্রামে নৌঘাঁটির মসজিদে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়া দুজনের একজনের বাড়ি টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার হাবলা গ্রামে। গত অক্টোবরে ঢাকায় খিজির খান হত্যায় গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবির জঙ্গি তরিকুল ইসলামের বাড়ি দেলদুয়ারে। তিনি ২০১৩ সালে ঢাকার গোপীবাগে ইমাম মাহদির প্রধান সেনাপতি দাবিদার লুৎফোর রহমানসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায়ও জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে সিঙ্গাপুর সরকার জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে ফেরত পাঠানো ২৬ জনের মধ্যে ৩ জনের বাড়ি টাঙ্গাইলে।
নিখিল হত্যার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, খুনিদের খুঁজতে গিয়ে তাঁরা এখন মূলত জেএমবি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। এরই অংশ হিসেবে জামিনে থাকা জেএমবির পাঁচ সদস্যকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁদের কাছে নিখিল হত্যাসংক্রান্ত কোনো তথ্য না মেলায় বৃহস্পতিবার ছেড়ে দেওয়া হয়।
নিখিল হত্যা মামলার তদন্তে যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, টাঙ্গাইলের পাশের দুই জেলা জামালপুর ও ময়মনসিংহে একসময় জেএমবির প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড ছিল। বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত জঙ্গি হামলাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হামলার পরিকল্পনার পর এক এলাকার জঙ্গিরা অন্য এলাকায় গিয়ে মূল অভিযানে অংশ নেন। তাই ওই এলাকাগুলো থেকে জঙ্গিরা এসেছেন কি না, সেটাও খতিয়ে দেখছেন তাঁরা। তাই এসব জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তথ্যবিনিময় করা হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) টাঙ্গাইলের সহসভাপতি বাদল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিখিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা হতবাক। এই হত্যাকাণ্ড এবং বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় টাঙ্গাইলের জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে। এসব দেখে মনে হচ্ছে, সবার অলক্ষ্যে টাঙ্গাইলে জেএমবি তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগের।’

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন