রাজধানীতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ গত রোববার গভীর রাতে আরও একজন নিহত হয়েছেন। তাঁর নাম রাসেল সরদার (২৫)। যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় ওই ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়। পরিবারের দাবি, দোকান কর্মচারী রাসেল গত বৃহস্পতিবার থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
কুমিল্লায় রোববার গভীর রাতে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’য় পেট্রলবোমা হামলা মামলার আসামি মো. সোহেল (২৪) নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
পুলিশ গতকাল সোমবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ডিবির সহকারী কমিশনার আফজাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল রোববার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় পৌঁছালে একদল সন্ত্রাসী হাতবোমা ও গুলি ছুড়তে শুরু করে। ‘জানমাল রক্ষায়’ পুলিশ পাল্টা ৪১টি গুলি চালায়। এতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকেন। পরে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, ভোর পাঁচটার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার এএসআই হুমায়ুন কবীর ‘অজ্ঞাত’ এক তরুণের গুলিবিদ্ধ দেহ হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর পরনে ছিল নীল রঙের জিনস, জলপাই রঙের জ্যাকেট। তাঁর মুখ, বুকে বেশ কয়েকটি গুলির চিহ্ন দেখা যায়।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মর্গে এসে মো. আকাশ লাশটি তাঁর বড় ভাই রাসেলের বলে শনাক্ত করেন। বেলা দুইটার দিকে নিহত ব্যক্তির স্ত্রী শেফালী আক্তার লাশ শনাক্ত করেন।
শেফালী জানান, ছয় মাস আগে পরিবারের অমতে তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁরা নারায়ণগঞ্জের পাগলায় ভাবির বাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। রাসেল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের নুরু মার্কেটে তাঁর ভাই আকাশের মুঠোফোন মেরামতের দোকানে কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রাসেল দোকানের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন।
আকাশ জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে রাসেল দোকানে এসে কিছু খাওয়ার জন্য ২০ টাকা চান। পরে রাসেল বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে ঢাকায় এসেছেন বলে তিনি শুনেছেন। এর পর থেকে রাসেলের আর কোনো খোঁজ নেই। তাঁর খোঁজে গত চার দিনে তিনি ঢাকার ১৭টি থানায় ও শেফালী নয়টি থানায় খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু খোঁজ মেলেনি। গতকাল সকালে একজন প্রতিবেশী তাঁকে জানান, তিনি টিভিতে রাসেলের মতো একজনকে দেখেছেন। তিনি মর্গে খোঁজ নিতে বলেন। এরপর মর্গে এসে লাশ শনাক্ত করেন।
শেফালী বলেন, চার-পাঁচ মাস আগে কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ একটি হত্যা মামলায় রাসেলকে আটক করেছিল। রাসেল কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে দাবি আকাশ ও শেফালীর।
রাসেলের গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়ায়। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ ছিলেন।
এ নিয়ে গত ২৪ দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৯ জন নিহত হলেন। এর মধ্যে গত সপ্তাহে ওই কাঠেরপুল এলাকায় র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই দোকান কর্মচারী নিহত হন। তাঁরাও কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন বলে পরিবার দাবি করেছে। ২৩ জানুয়ারি কাঠেরপুল এলাকায় বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ২৮ জন দগ্ধ হন। তাঁদের একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
‘সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত’: নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা ও দাউদকান্দি প্রতিনিধি জানান, দাউদকান্দি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান বলেন, রোববার দিবাগত রাত তিনটার দিকে দাউদকান্দি উপজেলার হাসানপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আহত অবস্থায় সোহেলকে পড়ে থাকতে দেখে পুলিশ। তাঁকে উদ্ধার করে গৌরীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। গতকাল সকালে দাউদকান্দি থানার পুলিশ তাঁর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। সোহেল চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার এলাকায় ২ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে আইকন পরিবহনের বাসে পেট্রলবোমা হামলা মামলার ৫৩ নম্বর আসামি ছিলেন। ওই মামলার ৮ নম্বর আসামি চৌদ্দগ্রাম উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাহাবউদ্দিন পাটোয়ারী শুক্রবার ভোরে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। ওই পেট্রলবোমা হামলায় পুড়ে মারা যান আটজন। আহত হন অন্তত ২৭ জন।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত সোহেলের বিরুদ্ধে চৌদ্দগ্রাম থানায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও অস্ত্র মামলাসহ অন্তত ১২টি মামলা রয়েছে। তাঁর বাড়ি চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর এলাকায়। তাঁর বাবার নাম বাবুল মিয়া।
খবর পেয়ে স্বজনেরা মর্গে গিয়ে সোহেলের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে এ ব্যাপারে পরিবারের কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
মিয়াবাজার ও জগমোহনপুরের অন্তত তিনজন বাসিন্দা জানান, সোহেল টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র নিয়ে ভাড়া খাটতেন। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম চক্রবর্তী বলেন, সোহেল বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় করা দুটি মামলার এজাহারনামীয় ৫৩ নম্বর আসামি। তিনি তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। দাউদকান্দিতে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেছেন।
গত ২৬ জানুয়ারি রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আটকের পর ‘ট্রাকচাপায়’ ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক কর্মী এবং ২ ফেব্রুয়ারি যশোরে ‘ট্রাকচাপায়’ বিএনপির দুই সমর্থক নিহত হন।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন