উত্তরের জেলা দিনাজপুরে পুলিশের হিসাবে শুধু মাদক ব্যবসায়ীই আছেন ৩ হাজার। তবে মাদকসেবীর সংখ্যা কত, সে হিসাব পুলিশের খাতায় নেই। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের হিসাবে, গত এক বছরে মাদক সেবনের কারণে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশের আর কোনো জেলায় এক বছরে এত মাদকসেবীর মৃত্যুর রেকর্ড নেই বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

জেলার বাসিন্দারা বলছেন, দিনাজপুর জেলায় মাদক ব্যবসা চালান ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা এবং কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। এর মধ্যে পৌরসভার এক কাউন্সিলর সরাসরি মাদক ব্যবসায় যুক্ত। জেলা পুলিশের কোনো কোনো সদস্যও মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মো. হামিদুল আলম নিজেও মাদকের ভয়াবহতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ইয়াবার কারণে গত এক বছরে মাদক ব্যবসা ও মাদকসেবী—দুটোই বেড়েছে। তারপরও সামাজিকভাবে মানুষ যাতে প্রতিরোধ করতে পারে, সে জন্য মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা বই আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। গত দেড় বছরে প্রায় পাঁচ
হাজার মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়েছেন। আর মাদক সেবনের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত ২ হাজার ৫৬৬ জনকে সাজা দিয়েছেন।

দিনাজপুরে কেন এত মাদক? এর জবাব মিলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। তাঁরা বলেছেন, জেলার তিন দিক দিয়ে মাদক আসে। কিছু মাদক আসে সরাসরি দিনাজপুর শহরে। হিলি ও সৈয়দপুর হয়ে আসে মাদকের চালান। হিলিতে যে চালান আসে তা হিলি, বিরামপুর, ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ী ও নবাবগঞ্জে ছড়িয়ে যায়। সৈয়দপুর হয়ে যা আসে, তা চিরিরবন্দর, খানসামা ও বীরগঞ্জ এলাকায় যায়। এভাবে পুরো জেলায় মাদক ছড়িয়ে যায়।

চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবার যে চালান দিনাজপুরে আসে, তা নিয়ন্ত্রণ করে উপশহরের সুফিয়া, দক্ষিণ কোতোয়ালির সালাম, জাহাঙ্গীর, দারিয়া লুৎফর, কাঠুরিয়া, আনারুল, মোসলেম, ঝলকা মিজান, দুখু মাঝি, সোলায়মান, স্টাফ কোয়ার্টারের কোরবান, কালুর মোড়ের রমজান, রামসাগর এলাকার সেরেকুল, মাতাসাগর এলাকার দুই বোন ববি ও সোমা, রেলগুমটির মিলন ও তাঁর শাশুড়ি, হঠাৎপাড়ার বিউটি, কমলপুরের ওয়াহেদ, তেঘরার গলাকাটা বাবু, দশমাইলের মুন্সি, সুন্দরার হালিম, কসবার সালাম ও মালিগ্রামের জাহাঙ্গীর। বিরল উপজেলার একটি ইউনিয়নের সাবেক এক চেয়ারম্যান এ চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

হিলির মাদক নিয়ন্ত্রণ করেন সাতকুড়ি গ্রামের মোরশেদ আলী ওরফে সুমন। সৈয়দপুর হয়ে দিনাজপুরে ইয়াবা আসা নিয়ন্ত্রণ করেন সৈয়দপুরের বাবুয়া। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে জেলায় মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬৩২। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার।

দিনাজপুর শহর থেকে সোজা দক্ষিণে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে রামসাগর। রামসাগরের পূর্ব দিকে নাপিতপাড়া গ্রাম। গ্রামে ঢুকতেই দুই পাশে চোখে পড়বে ফেনসিডিলের খালি বোতল। শহরের এক সাংবাদিককে নিয়ে মোটরসাইকেলে গিয়ে গ্রামের পাশে দাঁড়াতেই ছুটে আসেন এক যুবক। জানতে চান কিছু লাগবে কি না।

যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী দিনাজপুরের বিরামপুরে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মো. বকুল। তাঁর বিরুদ্ধে ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ ও রংপুরের পীরগঞ্জে মাদকের তিনটি মামলা রয়েছে।

জানতে চাইলে মো. বকুল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা আছে। মাদক ব্যবসার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব মিথ্যা। যার যা খুশি করুক।’

হিলির মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন কৃষ্টপুর মোল্লা বাজারের বাবুল মেম্বার, নুরন্নবী, ইটাই গ্রামের দেলোয়ার, বোয়ালদাড়ের দুই ভাই শাহিন ও শরিফুল, ইকবাল, ফারুক, ফেলু, নন্দীপুরের ইউনুস আলম, সাতকুড়ির শাহজাহান সেকেন্দার, রুবেল ও মংলার রবিউল। তাঁরা কেউই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ঘোড়াঘাটের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন সিংড়া ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামের মানুন মিয়া ও তাঁর ভাই আলিম মিয়া, দক্ষিণ দেবীপুর গ্রামের হারুন মিয়া, সিংড়া গ্রামের হাফিজুর রহমান, ধলিহার গ্রামের মো. আনিছ, অহিওড়া গ্রামের মো. আতিয়ার, মাঝিয়ান গ্রামের মো. সবুজ মিয়া, বিন্যাগাড়ির মাহবুবুর রহমান, কুলানন্দপুরের জাকিরুল, পৌর শহরের মধ্য নয়াপাড়ার রাজু মিয়া এবং লালবাগের রমজান আলী।

বিরলের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বিজোড়ার মোরশেদুল, কাঞ্চন নতুনপাড়ার হামিদুল, তেঘরার বাবু, আফসার আলী, কাশিডাঙ্গা শহরপাড়ার জোবাইদুল ও বান্দইলের গোলাম রব্বানী।

ফুলবাড়ীর মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন পৌর শহরের গৌরীপাড়ার সিরাজুল ইসলাম ওরফে গামা ও তাঁর জামাই ওয়াদুদ, কাটাবাড়ির মিলন, হাফিজা বেগম, মিরপুরের জলিল, ফরিদুল, রুদ্রানীর আলম, রামচন্দ্রপুরের আশরাফুল, উষাহার গ্রামের হাফিজুল, মানিক, শুক্র, জোয়ার গ্রামের মজিবর।

বীরগঞ্জের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে শহরের হাজি পরিবার নামের একটি পরিবার। তবে তাঁদের কেউই কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
দিনাজপুর শহরে মাদক ব্যবসায়ী বলে সবচেয়ে বেশি পরিচিত সুফিয়া বেগম। তাঁর পরিবারের প্রায় সবাই মাদক ব্যবসা করেন। এ ছাড়া তাঁর ১০ জনের একটি দল আছে। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক সরবরাহ করেন। সুফিয়ার খোঁজে তাঁর বাসায় গেলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। পরিবারের অন্য সদস্যরাও কথা বলেননি।

দিনাজপুর শহরের হাজির মোড়, বালুয়াডাঙ্গা, বটগাছতলা, কাস্টম অফিস মোড়, অন্ধ হাফেজ মোড়, লম্বাপাড়া, শেখপুরা, লাইনপাড়, ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড, কাঞ্চন কলোনি, রামনগর, আরবান ক্লিনিকের মাঠ, রেলবাজার নতুনপাড়া, রাজবাড়ী, কালুর মোড়, বড়গুলগুলা, গুঞ্জাবাড়ি, মেদ্দাপাড়া, মাঠের পাড়া, কসবা, পুলহাট, নয়নপুর, সুইহারি, খোকন মলভীর মোড়, স্টাফ কোয়ার্টার মোড়ে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হয়। এলাকাবাসীর তথ্যমতে, শহরের বাহাদুর বাজারের একটি আবাসিক হোটেলে শিক্ষার্থীরা মাদক সেবন করে বলে শোনা যায়।

শহরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভাবনা মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এখন অনেক কিশোর ও কিশোরী মাদক সেবন করছে। এ সেবনের হার দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

দিনাজপুর সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে জানান, সামাজিক-পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। এতে অল্প বয়সের সন্তানেরা মাদকাসক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, সমাজ ভালো রাখা যাঁদের দায়িত্ব, তাঁরাই মন্দ লোকজনের সঙ্গে মিশে নিজেরা লাভবান হচ্ছেন, তাহলে মাদক দূর হবে কী করে?

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন