default-image

শুক্রবার রাত তখন প্রায় তিনটা। ঘটনাটি এত আকস্মিক যে ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই ঝলসে গেল বাদশা মিয়ার মুখমণ্ডল, শরীরের ডান পাশ। সন্ধ্যার দিকে নওগাঁ শহর থেকে ট্রাকে চাল বোঝাই করে সহকারী গফুরকে নিয়ে বাদশা রওনা দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের দিকে। ঢাকা শহর ছাড়িয়ে তখন পৌঁছেছেন কাঞ্চন সেতুর কাছে। নির্জন সড়কের পাশের ঝোপ থেকে কে যেন বেরিয়ে এসে আচমকা কিছু একটা ট্রাকের চালকের আসনের দিকে ছুঁড়ে দিয়েই দৌড়ে পালাল।
গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের বিছানায় আধপোড়া বাদশা মিয়া বলছিলেন, নিমিষে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। তিনি দ্রুত ব্রেক করে গাড়ির গতি কমিয়ে গফুরকে এক ধাক্কায় পাশের দরজা দিয়ে বাইরে ঠেলে দেন। নিজেও লাফিয়ে পড়েন পথে। তাঁর জামাকাপড়ে আগুন ধরায় রাস্তার ওপরই গড়াগড়ি দিয়ে কোনোমতে আগুন নিভিয়ে ফেলেন। গফুর তেমন আহত হননি। কিন্তু বাদশার মুখ ও শরীরের ডান পাশ ঝলসে গেছে।
বার্ন ইউনিটে প্রবেশ করলে মনে হয় ভয়ংকর কোনো দুঃস্বপ্ন যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে চোখের সামনে। বিছানা, মেঝে, সামনের করিডরে সারি সারি আগুনের পোড়া নানা বয়সী মানুষ। বিভৎস! তাকানো যায় না। কারও দুই হাত, কারও বুক-পিঠ, কারও পা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। কারও স্যালাইন চলছে। অচেতনের মতো পড়ে আছেন বিছানায়। কেউ বসে, কেউ আধশোয়া হয়ে কাতরাচ্ছেন দুর্বিষহ যন্ত্রণায়। স্বজনেরা অশ্রু টলমল চোখে বসে আছেন পাশে। কেউ বা আপনজনের পুড়ে যাওয়া প্রিয় মুখে পরম মমতায় মাখিয়ে দিচ্ছেন মলম। আর্তনাদ ছাড়া কারও মুখে কোনো কথা নেই।
গতকাল শনিবার বিকেল পর্যন্ত বাদশা মিয়াই ছিলেন চলমান সহিংসতায় আহত নতুন রোগী। এর আগের দিন ভর্তি হয়েছেন আরও তিনজন। তাঁদের মধ্যে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার প্রৌঢ় মামুনুর রশীদ করিডরে পাতা বিছানায় অচেতনের মতো পড়ে আছেন। স্যালাইন চলছে। বিছানার পাশে বসে শুকনো মুখে বসেছিলেন তাঁর স্ত্রী গোলজে আরা বেগম। স্বামীর অবস্থার কথা বলতে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। পান ব্যবসায়ী মামনুর ঝিনাইদহ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার পান ট্রাকে বোঝাই করে বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দিয়েছিলেন। বগুড়ার তিন মাথা এলাকায় তাঁদের ট্রাকে পেট্রোলবোমা হামলা হয়। মামনুরের তিন মেয়ে এক ছেলে। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। গোলজে আরা বলছিলেন, জমিজমা না থাকলেও স্বামীর ক্ষুদ্র ব্যবসায় মোটা ভাত আর মোটা কাপড়ে সুখেই ছিলেন তাঁরা। এখন এক দিকে স্বামীর জীবন সংকটাপন্ন অন্য দিকে পুঁজিপাট্টা সব শেষ। পানগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। একেবারে পথে বসা বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা-ই। কীভাবে এখন দিন যাবে, সে দুশ্চিন্তায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।
অন্য দুজনের মধ্যে ঝালকাঠির কাভার্ড ভ্যানের চালক ১৮ বছরের তরুণ বাচ্চু মিয়া ঢাকা থেকে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রামে। ফেনীর লালপুরে বৃহস্পতিবার রাত একটার দিকে তিনি পেট্রোলবোমা হামলার শিকার হন। আর মিষ্টি ব্যবসায়ী বগুড়ার মহাস্থানের বাদশাহ সরকার বৃহস্পতিবার বগুড়া থেকে সিএনজি স্কুটারে বাড়ি ফেরার পথে মাটিডালিতে পেট্রোলবোমা হামলার কবলে পড়েন। এই দুজনেরও মুখমণ্ডল, বুক, হাত ও শরীরের অনেকটা অংশ পুড়ে গেছে।
প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গুরুতর অবস্থায় তিন-চারজনকে বার্ন ইউনিটে আনা হচ্ছে। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও অনেক হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শঙ্কর পাল প্রথম আলোকে জানান, সুচিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসক ও সেবিকাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গতকাল থেকেই ২০ জন চিকিৎসক ও ১০ জন সেবিকা নিয়ে একটি দলের ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। এরপর আরও একটি দলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন