default-image

১০৮টি দেশের সাড়ে ১২ হাজারের বেশি মানুষ অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, যাঁদের পাসপোর্ট, ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। তাঁদের অনেকে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রে জড়িত। আবার অনেকে নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এবং কর ফাঁকি দিয়ে উপার্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দেশে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের নজরদারিতে রাখার কাজ করে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৭৯০। এর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি হচ্ছেন ভারতের নাগরিক। এরপরই রয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা। এঁদের কেউ ভ্রমণ ভিসায়, কেউ ব্যবসায়িক ভিসায়, কেউবা ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসায় এ দেশে এসে অবৈধভাবে রয়ে গেছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৭ বছর ধরে আছেন মিসরের ছয় নাগরিক। আর সর্বনিম্ন অবৈধ অবস্থানকারীরা আছেন তিন বছর ধরে।

বিজ্ঞাপন
১০৮টি দেশের নাগরিক অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। অনেকে চাকরি করছেন, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। অপরাধী চক্রেও জড়িত অনেকে।

এদিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এখন বৈধ বিদেশিদের সংখ্যা প্রায় তিন–চতুর্থাংশ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন অভিবাসন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সরকারি হিসাবে এখন বৈধভাবে ১৪০টি দেশের ২০ হাজার ১৯৭ জন নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার ৯৭৪ জন হলেন ভারতের নাগরিক। এরপরই চীনের ২ হাজার ৯৩ জন।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বিদেশি কর্মী কাজ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা (এনজিও), হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অনেক বিদেশি কর্মরত। তাঁদের অনেকে কর ফাঁকি দিচ্ছেন। অনেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাজ করে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা প্রতিবছর অবৈধভাবে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন।

দেশে সাড়ে ১২ হাজারের বেশি বিদেশির অবৈধভাবে অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এত বিপুলসংখ্যক বিদেশির বাংলাদেশে অবস্থানের কোনো তথ্য নেই।’ তিনি বলেন, ভিসার মেয়াদের বেশি অবস্থান করলে অর্থদণ্ডসহ জরিমানা হওয়ার কথা। করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় আগমনী ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

অথচ গত বছরের ৭ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা–সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, অবৈধভাবে অবস্থানকারী ১১ হাজার বিদেশি নাগরিককে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এরপর এক বছর পার হয়েছে। এর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের রাখার মতো কোনো ডিটেনশন সেন্টার বা আটককেন্দ্র এখানে নেই। তাঁদের কারাগারে রাখতে হলে মামলা দিতে হয়। সেটা সময় ও অর্থসাপেক্ষ ব্যাপার। তাই একটি ডিটেনশন সেন্টার প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া চলছে।

কীভাবে আসছেন তাঁরা

অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের ৩৩ ধরনের ভিসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ভিসা অন অ্যারাইভাল (ভিওএ), বি (ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়ী প্রতিনিধি), এ৩ (বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয়/বহুপক্ষীয় চুক্তির আওতায় প্রকল্পে নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ বা পরামর্শক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক), টি (ভ্রমণ) ও পি (খেলোয়াড়) ভিসায় আসা ব্যক্তিদের একটা অংশ মেয়াদ শেষেও থেকে যাচ্ছেন।

এ–সংক্রান্ত এসবির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বর্তমানে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের মধ্যে ৪ হাজার ৬৪১ জন ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালে ভ্রমণ ভিসায় এ দেশে এসেছিলেন। প্রায় দুই হাজার এসেছিলেন বি ভিসায় (ব্যবসাসংক্রান্ত কাজের ভিসা)।

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, কাজের অনুমতি না থাকলেও বি ভিসায় এসে অনেকে বেআইনিভাবে দেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি নেন। এ ধরনের ভিসায় সবচেয়ে বেশি আসেন চীনের নাগরিকেরা। বিভিন্ন প্রকল্প এবং চীনা নাগরিকদের বিনিয়োগ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁরা কাজ করেন। এ ছাড়া ভারতের অনেকে ভ্রমণ ভিসায় এসেও এখানে নানা কাজ বা চাকরিতে যুক্ত হন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর নির্বাহী পরিচালক সি আর আবরারের মতে, এ দেশে বৈধভাবে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরাও সঠিক ভিসায় অবস্থান করছেন কি না, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেই থাকবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সে দেশে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) পাঠানো দেশগুলোর প্রথম পাঁচটির মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। সে অনুযায়ী বৈধ ও অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয়দের সংখ্যার সামঞ্জস্য আছে কি না এবং তাঁরা যে কর দিচ্ছেন, সেটা ঠিক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

বাংলাদেশের ভিসা নীতিমালা অনুযায়ী ইউরোপের প্রতিটি দেশ, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৩টি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, মিসর, ব্রুনেই ও তুরস্কের নাগরিকেরা অন অ্যারাইভাল বা বিমানবন্দরে নেমে তাৎক্ষণিক ভিসা পেয়ে থাকেন। অভিবাসন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অন অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া অধিকাংশ দেশেরই কোনো না কোনো নাগরিক অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ কোরিয়ার, বর্তমানে যার সংখ্যা ৫৪৮।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রিমিয়ার লিগের আগে ফুটবল ক্লাবগুলো অনলাইনে খেলোয়াড়দের আমন্ত্রণপত্র দেয়। এ ক্ষেত্রে নিজেদের চাহিদার চেয়ে বেশিসংখ্যক আমন্ত্রণপত্র দেয় তারা। ক্লাবের আমন্ত্রণে আসার পর পরীক্ষামূলক ম্যাচের মাধ্যমে মান যাচাই করে খেলোয়াড়দের রাখে ক্লাবগুলো। যাঁদের বাদ দেওয়া হয়, তাঁদের ফেরত পাঠানোর কথা ক্লাবগুলোরই। কিন্তু তারা কাজটি করে না। এর ফলে খেলোয়াড় হিসেবে আসা অনেকে অবৈধভাবে থেকে যান।

যুক্ত হচ্ছেন অপরাধেও

পুলিশ সূত্র জানায়, প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত কয়েক মাসে আফ্রিকার আটটি দেশের অর্ধশতাধিক নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড জালিয়াতি করে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম থেকে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ইউক্রেনের ছয়জন। গত ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এসবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের অনেকে মানব পাচার, চোরাচালান, তথ্যপ্রযুক্তি, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, জাল মুদ্রা, মাদকসংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। ভিসা–সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিবিধানের কঠোরতা থেকে পরিত্রাণের জন্য আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশের অপরাধপ্রবণ নাগরিকেরা এ দেশের মেয়েদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করছেন বলেও এসবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন মামলায় কারাগারে বন্দী ছিলেন ১৮টি দেশের ৯৩২ জন নাগরিক।

গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারে কিছু সীমাবদ্ধতা

অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বলছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এসবির প্রতিবেদনে বলা হয়, আটক অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের কাছে পাসপোর্ট থাকে না। অনেক সময় তাঁরা ইচ্ছা করে পাসপোর্ট গোপন করেন। এ অবস্থায় এই বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর আগে নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রয়োজন হয়, যা সময়সাপেক্ষ। আবার অনেক দেশের দূতাবাস এখানে নেই। এমন দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই ও ভ্রমণ দলিল সংগ্রহ করা আরও বেশি সময়সাপেক্ষ। যেসব দেশের দূতাবাস আছে, তারাও সব সময় দ্রুত সহযোগিতা করে না। অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করলে তাঁরা মামলার অজুহাতে এ দেশে থেকে যান।

ওই প্রতিবেদনে এসবি বলেছে, ফরেন অর্ডার ১৯৫১–এর ১৪ ধারা অনুযায়ী প্রত্যাবাসন ও অবস্থানের খরচের কথা বলা আছে। আটকের পর থেকে প্রত্যাবাসনের আগপর্যন্ত অবৈধ অভিবাসীকে ‘সেফ হোমে’ অন্তরীণ রাখার ব্যবস্থা এবং বিমানের টিকিটসহ প্রত্যাবাসনকাজের ব্যয় বহন করার জন্য অভিবাসন পুলিশের কাছে বরাদ্দ থাকবে। কিন্তু সেফ হোম নেই এবং প্রত্যাবাসনের জন্যও কোনো বরাদ্দ নেই।

রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সি আর আবরার প্রথম আলোকে বলেন, অবৈধ বিদেশিদের মধ্যে যাঁরা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। যাঁরা নিরুপায় হয়ে থাকছেন, তাঁদের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে মানবিকতার সঙ্গে। যাঁরা বৈধভাবে এসে কাজ করছেন, তাঁদের আরও নজরদারির মধ্যে আনা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0