default-image

ঢাকার বারিধারার আমেরিকান দূতাবাসের পূর্ব দিকের প্রধান সড়কসংলগ্ন সরু রাস্তা ধরে তিন কিলোমিটার যাওয়ার পর নয়ানগর এলাকা। নয়ানগরের একটি অংশে মানুষের মধ্যে ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি। তাই অংশটির নামই হয়ে গেছে ফাঁসেরটেক।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, পাঁচ দশক আগে নয়ানগরে একটি কড়ইগাছের সঙ্গে গলায় দড়ি দিয়ে এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেন। গাছটি ছিল জলাভূমির মধ্যে একটু উঁচু এলাকায়, যা টেক নামে পরিচিত। সেই থেকে ফাঁসেরটেক নামটি আসে। এরপর সেখানে আরও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। যে কারণে নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এখন শুধু মানুষের মুখে নয়, দোকানপাটের সাইনবোর্ড, ঠিকানা ও পুলিশের নথিতে ফাঁসেরটেকই ব্যবহৃত হয়।

ফাঁসেরটেকে আত্মহত্যার ঘটনা এখনো বেশি। ভাটারা থানার পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ১৬ মার্চ পর্যন্ত ফাঁসেরটেক ও আশপাশে ফাঁস নিয়ে ১৪ জন নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করেন। এর আগের হিসাব পুলিশের কাছে নেই।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ, কোনো ক্ষেত্রে মারধরের শিকার হয়ে, আবার কোনো ক্ষেত্রে মানসিক ভারসাম্যহীনতা থেকে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। তবে ফাঁসেরটেক নামটিই মানুষকে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও প্ররোচনা দিতে পারে বলে আশঙ্কা অপরাধবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক ও একজন পুলিশ কর্মকর্তার।

পুলিশের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী প্রথম আলোকে বলেন, ফাঁসেরটেক নামটিই একধরনের ‘ট্রমা’ (মানসিক পীড়া) তৈরি করে। এ ধরনের নাম মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করতে পারে। তাই নামটি বদলাতে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্রবীণ ব্যক্তিদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ফাঁসেরটেকে মূলত নিম্ন আয়ের মানুষের বাস। এর একটি কারণ এ এলাকায় বাসাভাড়া কম। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙা সড়কের দুই ধারে গড়ে ওঠা বেশির ভাগই টিনের ছাপরা ঘর। ৫০ বছর আগে যেখানে কড়ইগাছে গলায় দড়ি দিয়ে একজন আত্মহত্যা করেছিলেন, সেই জায়গাটিতে এখন ঘরবাড়ি ও কয়েকটি চায়ের দোকান।

সেখানকার একটি টিনশেড বাড়ির মালিক দুলাল হোসেন (৬০)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে কড়ইগাছের গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে তিনি বাবার কাছে শুনেছেন। তখন ঘটনা শুনে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসেছিল।

ফাঁসেরটেকে ৩৫ বছর হলো বসবাস করছেন জাহাঙ্গীর আলম (৫৫)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যখন প্রথম ফাঁসেরটেক যান তখন বর্ষায় যাতায়াত করতে হতো নৌকায়। গুলশান থেকে নৌকার ব্যবস্থা ছিল। তবে গত ১৫ থেকে ২০ বছরে নিচু জমি ভরাট করে সড়ক ও ঘরবাড়ি হয়েছে।

ফাঁসেরটেকে গত বছরের ১১ নভেম্বর ভাড়া বাসায় বৈদ্যুতিক পাখা বা ফ্যানের সঙ্গে ওড়না বেঁধে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন কাঠমিস্ত্রি বিল্লাল হোসেন (২৮)। তাঁর বড় বোন মুন্নী আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, বিল্লাল সপরিবার ফাঁসেরটেকে থাকতেন। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে বিল্লালের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর পারিবারিক বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। এরপর বিল্লালের স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে চলে যান। চার দিনের মাথায় ঘরের ভেতরে বিল্লালের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২০ সালে ১১ হাজার ২৫৯ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন, যা আগের বছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি। তরুণদের সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনা অনুযায়ী, পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকট—এসব আত্মহত্যার বড় কারণ।

আত্মহত্যার হিসাব রাখে পুলিশ সদর দপ্তরও। তাদের হিসাবে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে ৫৪ হাজার ৩৯ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। বেশির ভাগ ঘটনা ঘটেছে ফাঁস দিয়ে ও বিষপানে। এর বাইরে ঘুমের ওষুধ খাওয়া, উঁচু স্থান থেকে লাফিয়ে পড়া ও চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়ার মতো ঘটনাও ছিল।

ফাঁসেরটেকে গত কয়েক দশকে কত মানুষ আত্মহত্যা করেছেন, তার কোনো হিসাব স্থানীয় থানার কাছে নেই। কারণ জানতে চাইলে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোক্তারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, আত্মহত্যার পর অপমৃত্যুর মামলা হয়। তবে অপমৃত্যুর মামলার নথিপত্র পাঁচ বছর পর থানায় আর সংরক্ষণ করা হয় না।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ জানিয়েছে, ফাঁসেরটেকে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে জনপ্রিয় চিত্রনায়িকাদের নিয়ে বেসরকারি কিছু সংস্থার মাধ্যমে সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। করোনা সংক্রমণ শুরুর পর এই কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে।

ফাঁসেরটেকের নাম পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগের কথাও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল না। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ঢালী প্রথম আলোকে বলেন, নাম বদলানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এলাকার নামের জন্য আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটছে কি না, তা তিনি বলতে পারছেন না।

অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ফারজানা রহমান মনে করেন, নানা কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। ফাঁসেরটেক নামটি কিছুটা হলেও আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিতে পারে। তিনি বলেন, যাঁরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে চান, তাঁরা যেসব স্থান পছন্দ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সেসব স্থানে নজরদারি বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের ভেতরে কারও আত্মহত্যার প্রবণতা থাকলে বা তৈরি হলে তা চিহ্নিত করে সঠিক কাউন্সেলিং দেওয়া।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন