ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত দেড় বছরে ৫১ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করেছে। তাঁদের ৪০ জনই আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। কিন্তু বহিষ্কারাদেশের চিঠি সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে না পৌঁছানোয় আদেশগুলো পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি।
প্রক্টরিয়াল আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী, বহিষ্কৃত থাকাকালে শিক্ষার্থী কোনো ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না এবং হলে থাকতে পারবেন না। সাময়িক বহিষ্কৃতদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। কিন্তু আদেশের চিঠি সংশ্লিষ্ট বিভাগ-দপ্তরে না পৌঁছানোর সুযোগে বহিষ্কৃতদের অনেকে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, ফল পেয়েছেন। হলে থেকেছেন বা থাকছেন। সাময়িক বহিষ্কারাদেশ তুলেও নিয়েছেন কেউ কেউ। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এসব জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী হওয়ায় ঘটনার পরপরই তা ধামাচাপা দিতে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু এটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলীও বলেছেন, ‘বহিষ্কৃতরা পরীক্ষা দিচ্ছে, এমন কয়েকটি অভিযোগ আমরাও পেয়েছি। পরে প্রতিটি বিভাগে আবার নতুন করে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেছি, যাতে বহিষ্কৃতদের কোনোভাবেই ক্লাস বা পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া না হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কার্যালয় থেকে জানা যায়, অপহরণ, যৌন হয়রানি, সাংবাদিক নির্যাতন, সংঘর্ষ, কক্ষ ভেঙে চুরি, শিক্ষককে হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪টি বিভাগের ৫১ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে আজীবন বহিষ্কারের সুপারিশ, এক বছরের জন্য নয়জন, ছয় মাসের জন্য একজন ও ৩৯ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছাত্রলীগের একটি হল শাখার সভাপতিসহ সাতজন পদধারী নেতা।
সূত্র জানায়, বহিষ্কার-সংক্রান্ত চিঠি শিক্ষার্থীর স্থায়ী ঠিকানা, সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিন, হলের প্রাধ্যক্ষ, বিভাগের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপ-রেজিস্ট্রার শিক্ষা ও উপ-রেজিস্ট্রার তদন্তসহ মোট ১২টি কার্যালয়ে যাওয়ার কথা। স্থায়ী ঠিকানায় চিঠি পাঠানো হয় ডাকযোগে রেজিস্ট্রি ছাড়াই। ফলে প্রাপক সেই চিঠি পেলেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে চেষ্টা-তদবির করে এ চিঠি আটকে দেওয়া হয়। কোনো কোনো শিক্ষার্থী স্থায়ী ঠিকানায় পাঠানোর কথা বলে নিজেই চিঠি নেন। এরপর চেষ্টা চলে বিভাগ ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে চিঠি যেন না পৌঁছায়।
সহ-উপাচার্য নাসরীন আহমাদ (শিক্ষা) বলেন, বহিষ্কার-সংক্রান্ত যেসব চিঠি তাঁদের দপ্তরে আসে, সেগুলো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বহিষ্কারাদেশ বাস্তবায়নের মূল কাজ প্রক্টর কার্যালয়, বিভাগ ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহালুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, প্রক্টরের কার্যালয় থেকে যাঁদের নামে চিঠি এসেছে, তাঁদের কাউকে পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেওয়া হয়নি। বহিষ্কারের কোনো কাগজপত্র না আসায় অনেকের পরীক্ষা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
দর্শন, উন্নয়ন অধ্যয়ন, সমাজবিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান, ইংরেজি, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস ও মার্কেটিং বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একমাত্র উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. শাহাবুদ্দীনকে এক বছরের জন্য বহিষ্কারের চিঠি পেয়েছে। ছাত্রী উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে তাঁকে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর বহিষ্কার করা হয়। তবে এই বহিষ্কারের মেয়াদ থাকাকালেই তিনি চলতি বছর দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন।
চিঠি না যাওয়ায় অন্য ছয় বিভাগের বহিষ্কৃতদের ক্ষেত্রে পদক্ষেপের বিষয়ে জানা যায়নি। বাকি ১৭টি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব বিভাগের বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরাও ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
গত বছরের জুলাইয়ের আগে বহিষ্কৃত দুই শিক্ষার্থী জানান, তাঁরা প্রক্টরের কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে বহিষ্কারের নথি ‘গায়েব’ করেছেন।
অবশ্য ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর বলেন, ‘বহিষ্কৃতরা পরীক্ষা দেয় মূলত বিভাগ কিংবা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের অবহেলায়। আমরা প্রতিটি জায়গায় চিঠি পাঠিয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করি।’
গত দেড় বছরে সবচেয়ে বেশি—ছয়জন বহিষ্কৃত হন দর্শন বিভাগ থেকে। তাঁদের মধ্যে সাময়িক বহিষ্কৃত দুজনের বিষয়ে ওই বিভাগে কোনো তথ্য নেই। এক বছরের জন্য বহিষ্কৃত তিনজনের মধ্যে দ্বিতীয় বর্ষের কাজল আহমেদ ও টমাস হোসেন সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সামনে ছাত্রী উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় বহিষ্কৃত হন গত বছরের ২০ ডিসেম্বর। চলতি বছরের ২৬ আগস্ট প্রকাশিত তৃতীয় সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলে দেখা যায়, কাজল জিপিএ ২ দশমিক ৮৩ ও টমাস জিপিএ-৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। আর ১৪ ডিসেম্বর বিভাগে গিয়ে নোটিশ বোর্ডে চতুর্থ সেমিস্টারের তিনটি বিষয়ের ইনকোর্সের ফলের তালিকায় তাঁদের নাম ও প্রাপ্ত নম্বর দেখা গেছে।
দর্শন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা পানু গোপাল পাল কাগজপত্র দেখে প্রথম আলোকে জানান, এই দুজনের নামে বিভাগে কোনো চিঠি আসেনি।
তবে বিভাগের বহিষ্কার-সংক্রান্ত ওই ফাইলে চতুর্থ বর্ষের আবদুল হামিদের বহিষ্কারাদেশের চিঠি দেখা যায়। মল চত্বরে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় সূর্য সেন হলের ছাত্রলীগ কর্মী হামিদকে গত বছরের ১৪ জুলাই এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। নোটিশ বোর্ডে ইনকোর্স পরীক্ষার ফলের তালিকায় তাঁর নামও রয়েছে। অবশ্য পরে আবার বিভাগে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, তাঁকে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়নি। সূর্য সেন হলের ৫৭২ নম্বর কক্ষ ভেঙে চুরির ঘটনায় একই বিভাগের প্রথম বর্ষের মেশকাত হাসানকে গত ২১ সেপ্টেম্বর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে ১৯ নভেম্বর তাঁকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। একই ঘটনায় সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের খ ম মুহতাসিম মাহমুদকে আজীবন বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে তা এখনো সিন্ডিকেটে ওঠেনি।
মল চত্বরে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় এক বছরের জন্য বহিষ্কৃত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মিজানুর রহমানও পরীক্ষা দিয়েছেন। একই ঘটনায় অভিযুক্ত ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের বিদ্যুৎ মিয়া, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের জাকির হোসেন ও ইতিহাস বিভাগের হক মিয়ার পরীক্ষা বন্ধ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক নেতাদের হস্তক্ষেপে। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় শাস্তি পাওয়া সবাই সূর্য সেন হলের ছাত্রলীগের কর্মী। তাঁরা হলেই থাকেন।
ছাত্রী উত্ত্যক্তের ঘটনায় গত বছরের ২০ ডিসেম্বর ছয় মাসের জন্য বহিষ্কৃত ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রথম বর্ষের মিরাজুল ইসলাম একই বিভাগে পুনর্ভর্তি হয়েছেন। তিনি জহুরুল হক হলের ২৬৪ নম্বর কক্ষে থাকেন। তাঁর এক সহপাঠী জানান, বহিষ্কারের পরও তিনি হলে ছিলেন।
সাময়িক বহিষ্কারের পর কী হয়: প্রক্টরের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে সাময়িক বহিষ্কৃত বিভিন্ন বিভাগের ৩৯ জনের মধ্যে ১২ জনের পূর্ণ নাম-ঠিকানা নেই। বাকি ২৭ জনের মধ্যে ২২ জনের বিষয়ে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে মেশকাত ও মুহতাসিমের বিষয়ে পরে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাকি ২০ জনের বিষয়ে পরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়া হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে জানা যায়নি। জানা গেছে, তাঁরা ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
গত দেড় বছরে সমাজবিজ্ঞানের চারজন সাময়িক বহিষ্কার হয়েছেন। এ বিষয়ে ওই বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামরুল আলম জানান, পরীক্ষা-সংক্রান্ত কারণে বহিষ্কৃতদের তথ্যই কেবল তাঁদের কাছে আছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো কাগজ প্রক্টরের কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়নি।
প্রক্টরের কার্যালয়ে পূর্ণ নাম-ঠিকানা না থাকা সাময়িক বহিষ্কৃত ১২ জনের বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত ডাকনাম ব্যবহার করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কার্জন হল এলাকায় বহিরাগত এক আলোকচিত্রীকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ৫ নভেম্বর শহীদুল্লাহ হলের সাময়িক বহিষ্কৃত চার ছাত্রলীগ কর্মীর একজনকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম বর্ষের মাসুম উল্লেখ করে চিঠি ইস্যু হয়। ১২ নভেম্বর প্রথম আলোতে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম বর্ষে মাসুম নামে কেউ নেই। পরে প্রশাসন খোঁজ নিয়ে জেনেছে, তাঁর পুরো নাম মাসুম বিল্লাহ, ফার্মেসির ছাত্র।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর বলেন, সাধারণত প্রাথমিকভাবে কাউকে বহিষ্কার করা হলে তাঁর পুরো নাম অনেক সময় পাওয়া যায় না। পরে সংশ্লিষ্ট হল থেকে পূর্ণ নাম-ঠিকানা জোগাড় করে সমন্বয় করা হয়।
হল প্রাধ্যক্ষকে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় বঙ্গবন্ধু হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি দারুস সালাম ও সাধারণ সম্পাদক ইয়াজ আল রিয়াদকে চলতি বছরের ১৩ আগস্ট সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তাঁরা হলেই থাকছেন। দারুস সালাম দাবি করেন, তিনি বহিষ্কৃত হননি। ইয়াজ ইসলামের ইতিহাসের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বহিষ্কার করার পর যদি কারও পরীক্ষা কাছাকাছি সময়ে থাকে, তবে তাঁকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়। তবে তাঁর পরীক্ষার ফল প্রকাশ না করার নিয়ম রয়েছে। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন