default-image

ঘরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা ও অসুস্থ মা। মা–বাবার চিকিৎসা করানোর কথা অনেকবারই ভেবেছেন সোহেল (২৮)। কিন্তু অভাবের সংসারে সোহেলের তা আর হয়ে ওঠেনি।
চার বছর আগে মামুন (২৬) নামের এক তরুণকে অপহরণ ও গুম করার অভিযোগে মামলা দায়েরের পর ভাঙারি দোকানে কাজ করা সোহেলকে তাঁর উপার্জনের প্রায় সবই ব্যয় করতে হয় মামলার খরচ জোগাতে। এ ছাড়া সোহেলকে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু ওই যন্ত্রণাকে বড় করে দেখতে নারাজ তিনি। অসুস্থ মা–বাবার চিকিৎসা করতে না পারার যন্ত্রণা তাঁর কাছে শরীরের যন্ত্রণার চেয়েও অনেক বড়।
সোহেল চাঁদপুরের মতলব উত্তর মহিষমারীর মো. হোসেনের ছেলে। ২০১৬ সালের ৯ মে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় ছয় আসামির বিরুদ্ধে ওই মামলা করা হয়। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফতুল্লা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমানের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। ওই মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে এক মাস কারাভোগ করেছিলেন সোহেল। তবে মামলার চলার সময় নিখোঁজের প্রায় ছয় বছর পর গত বুধবার নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজির হন মামুন। মামুন আদালতকে জানান, মায়ের সঙ্গে অভিমান করে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন। তাঁর নিখোঁজের সঙ্গে আসামিদের দায় নেই। অথচ গত চার বছরে মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছে ছয় আসামির পরিবার। গ্রেপ্তারের পর ও রিমান্ডে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাঁরা। প্রথম আলোর কাছে সেই নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন মামলার তিন আসামি।

বিজ্ঞাপন

মামলার ৩ নম্বর আসামি সোহেল প্রথম আলোকে জানান, ফতুল্লার লামাপাড়ার খালার বাড়ি থেকেআরেক আসামি তাঁর খালাতো ভাই সাগর ও তাঁকে গ্রেপ্তার করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। পরে থানার একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে তাঁর দুই হাত পেছন থেকে বেঁধে ফেলেন এক পুলিশ। ভেজা গামছা দিয়ে মুখ ও চোখ বেঁধে হাঁটু ও কোমরে পেটানো হয় তাঁকে। পরে দুই পা বেঁধে ফেলে হাত ও পায়ের মাঝখানে লাঠি দিয়ে থানার মেঝেতে ফেলে দেওয়া হয়। সোহেল বলেন, ‘এ সময় আমার গায়ের ওপর উঠে বসতেন এক পুলিশ। আরেকজন আমার মাথা চেপে ধরে নাকে পানি ঢালতে থাকতেন। আমাকে হত্যার বর্ণনা দিতে জোর করতেন। এভাবে চার দিন চলার পর আমাদের আদালতে নেওয়া হয়। পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে এসে একই কায়দায় নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে পুলিশ। একসময় আমি বাঁচার জন্য বলি, আপনি যা শেখাবেন, তা–ই বলব। তাঁরা আমাকে হত্যার ঘটনা স্বীকার করতে বলেন। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আমি সে কথা বলিনি।’

গ্রেপ্তারের পর পুলিশি নির্যাতনের প্রায় একই রকম বর্ণনা দেন মামলার দুই আসামি সাগর (২০) ও সাত্তার মোল্লা (৪৮)।
সাগরের মা আমিনা খাতুন জানান, একদিন তাঁর সামনেই পেটানো হয় ছেলে সাগরকে। সাগরের কোমরে মারধরের পর সাগর চিৎকার করছিলেন, উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না। এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সহায়তা নেন তিনি। পরদিন সংবাদ প্রকাশ হলে গ্রেপ্তারের চার দিন পর আদালতে নেওয়া হয় তিনজনকে।

একদিকে সন্তান অপর দিকে সবাই নিকট আত্মীয়। তাই তাঁদের বাঁচাতে গ্রামের বাড়িতে থাকা শেষ আশ্রয়টুকুও বিক্রি করতে হয় আমিনাকে। জমি বিক্রির সব টাকা খরচ করে আমিনা এখন নিঃস্ব।
তবে নির্যাতনের অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মিজানুর। তিনি বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের পরদিনই আদালতে নেওয়া হয়েছিল। তাঁরা নিজেরাই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাঁরা সেটি করেননি।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে অভিযোগ করলে তদন্ত করে ওই এসআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
তদন্ত কর্মকর্তাদের আদালতে তলব
এ ঘটনায় মামলার তিন তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেছেন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফতাবুজ্জামানের আদালত। গত বুধবার আদালত এ নির্দেশ দেন। নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের ওসি আসাদুজ্জামান গতকাল রাতে মুঠোফোনে বলেন, আদালত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের এসআই মিজানুর রহমান, সিআইডির এসআই জিয়াউদ্দিন উজ্জ্বল ও তদারক কর্মকর্তা এএসপি হারুনুর রশিদকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যাসহ আদালতে হাজির হওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন