পাবনা সদর উপজেলার নিকিড়িপাড়া গ্রামে অগ্নিদগ্ধ মুক্তি খাতুন নামের এক গৃহবধূ গতকাল রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। যৌতুকের দাবিতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মুক্তির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর থেকে মুক্তির শ্বশুরবাড়ির লোকজন পলাতক।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তির (৩০) বাবার বাড়ি পাবনা পৌরসভার নারায়ণপুর মহল্লায়। বাবা নেই। মা রাজিয়া খাতুন মেসে রান্নার কাজ করেন। প্রায় আট বছর আগে হেমায়েতপুর ইউনিয়নের নিকিড়িপাড়া গ্রামের মৎস্য ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে হয় মুক্তির। তার পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মুক্তির ওপর অত্যাচার শুরু করে। এর মধ্যেই তাঁর পরশ (৬) ও আরশ (৪) নামের দুই ছেলের জন্ম হয়। কিন্তু অত্যাচারের মাত্রা কমেনি। মুক্তিকে তালাক দিতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁর স্বামীর ওপরও চাপ সৃষ্টি করত।
অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর প্রতিবেশী ও স্বজনদের কাছে নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দেন মুক্তি। তা ভিডিওতে ধারণ করেন প্রতিবেশী-স্বজনেরা। মুক্তির অভিযোগে জানা যায়, শনিবার দিবাগত রাতে তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত দুইটার দিকে শাশুড়ি এবং দুই দেবর মোহাম্মদ আলী ও মোহব্বত আলী তাঁর ঘরে ঢুকে প্রথমে মারধর করে। পরে ঘর থেকে বাইরে এনে ওড়না দিয়ে মুখ ও হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে বাড়ি থেকে বের করে বাড়ির প্রধান ফটক বন্ধ করে দেন। আগুনে মুখের বাঁধন পুড়ে গেলে তিনি চিৎকার শুরু করেন। তখন প্রতিবেশীরা এসে তাঁকে উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।
মুক্তির মারা যাওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজন পলাতক। মুক্তির স্বামী জসিম কিছুদিন আগে তাবলিগে গেছেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
দগ্ধ অবস্থায় মুক্তিকে দেখেছিলেন প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন। তিনি জানান, মুক্তির হাত ও মুখ একটি ওড়না দিয়ে বাঁধা হয়েছিল। তাঁর শরীর থেকে কেরোসিনের গন্ধও ছড়াচ্ছিল।
মুক্তির মামা মহিউদ্দিন বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর তাঁরা মুক্তির দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে এসেছেন। সকাল থেকে শিশু দুটি মায়ের জন্য কান্নাকাটি করছে। ঢাকা থেকে মুক্তির মা রাজিয়া খাতুন মেয়ের মৃতদেহ নিয়ে গতকাল রাতে পাবনার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। ঘটনাটি পুলিশকে জানানো হয়েছে। মুঠোফোনে রাজিয়া খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
মুকুল হোসেন নামে অপর এক প্রতিবেশী জানান, মেয়েটি বেশ শান্ত স্বভাবের ছিল। তাঁর ওপর অত্যাচারের বিষয়ে গ্রামের মানুষ বহুবার প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু ওই পরিবারটি কারও কথাই শুনত না। হেমায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনায় সবাই শোকে স্তব্ধ। আমরা অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহসানুল হক বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনার সঙ্গে মেয়েটির শাশুড়ি ও দুই দেবরের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু ঘটনার পর থেকেই ওই পরিবারের সব সদস্য পলাতক। নিহত মুক্তি খাতুনের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন