জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচার মামলায় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদারের সহযোগী অসীম কুমার মিস্ত্রিকে তিন দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ ইমরুল কায়েশ এই আদেশ দেন। প্রথম আলোকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন দুদকের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর।

default-image

পিপি মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, এ মামলায় গ্রেপ্তার অসীম কুমার পি কে হালদারের সহযোগী ছিলেন। তিনি পি কে হালদারের সম্পত্তির দেখাশোনা করতেন। বিদেশে টাকা পাচারে সহযোগিতা করেছেন। আসামি অসীম এই মামলায় গ্রেপ্তার অপর আসামি সুকুমার মৃধার আত্মীয়।

পিপি মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর জানান, এই মামলায় গ্রেপ্তার অসীম কুমার মিস্ত্রিকে আদালতে হাজির করে তিন দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে দুদক। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

বিজ্ঞাপন

আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত ২১ জানুয়ারি এ মামলায় গ্রেপ্তার পি কে হালদারের সহযোগী সুকুমার মৃধা ও তাঁর মেয়ে অনিন্দিতা মৃধাকে তিন দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেন আদালত। এর আগে এই মামলায় পি কে হালদারের সহযোগী অবন্তিকা বড়াল ও পি কে হালদারের মামাতো ভাই আসামি শঙ্খ ব্যাপারীকে গ্রেপ্তার করে দুদক। তাঁদের প্রত্যেককে তিন দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছিলেন আদালত।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন সম্প্রতি আদালতকে লিখিত এক প্রতিবেদন দিয়ে জানান, আসামি পি কে হালদার অসৎ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ২৭৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৫ টাকার সম্পদ অর্জন করেন। তদন্তকালে জানা যায়, আসামি পি কে হালদার বিদেশে পালিয়ে আছেন। আসামি শঙ্খ ব্যাপারীও বিদেশে পালানোর চেষ্টা করেন।

এর আগে গত বছরের ৮ জানুয়ারি প্রশান্ত কুমার হালদারের বিরুদ্ধে ২৭৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। তাঁর বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা পাচারেরও অভিযোগ আনা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পি কে হালদার ও তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, পি কে হালদারের হিসাবে ২৪০ কোটি টাকা এবং তাঁর মা লীলাবতী হালদারের হিসাবে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা। তবে এসব হিসাবে এখন জমা আছে ১০ কোটি টাকার কম। অন্যদিকে পি কে হালদার এক ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকেই ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বের করে নিয়েছেন। পি কে হালদারের দখল করা প্রতিষ্ঠান চারটি হলো ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। এর মধ্যে গত বছরের জুলাইয়ে পিপলস লিজিং অবসায়নের জন্য অবসায়ক নিয়োগ করা হয়েছে। চারটি প্রতিষ্ঠান দখলে নিলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেই পি কে হালদারের নিজের নামে শেয়ার নেই।

পি কে হালদারের জন্ম পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামে। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তাঁর মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পি কে হালদার ও প্রীতিশ কুমার হালদার—দুই ভাই-ই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। পি কে হালদারের পুরো নাম প্রশান্ত কুমার হালদার।
২০০৮ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে উপব্যবস্থাপনা (ডিএমডি) পরিচালক ছিলেন পি কে হালদার। ১০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৯ সালে তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই ভাই মিলে ভারতে হাল ট্রিপ টেকনোলজি নামে কোম্পানি খোলেন ২০১৮ সালে, যার অন্যতম পরিচালক প্রীতিশ কুমার হালদার। কলকাতার মহাজাতি সদনে তাঁদের কার্যালয়।


আর কানাডায় পিঅ্যান্ডএল হাল হোল্ডিং ইনক নামে কোম্পানি খোলা হয় ২০১৪ সালে, যার পরিচালক পি কে হালদার, প্রীতিশ কুমার হালদার ও তাঁর স্ত্রী সুস্মিতা সাহা। কানাডা সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কানাডার টরন্টোর ডিনক্রেস্ট সড়কের ১৬ নম্বর বাসাটি তাঁদের।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন