default-image

ফ্রান্সফেরত তরুণ সাইফ রহমানের সঙ্গে সিরিয়াভিত্তিক উগ্রবাদী সংগঠনের যোগাযোগের তথ্য পেয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। দুই দিনের রিমান্ডে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) হেফাজতে রয়েছেন তিনি। ফ্রান্স সরকার দেশটির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় সাইফকে সে দেশ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে।

গতকাল শনিবার সিটিটিসির উপকমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সাইফের ব্যবহৃত মুঠোফোন ও ল্যাপটপে সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। তবে সাইফ তাঁদের বলেছেন, ফরাসি পুলিশকে সহযোগিতার জন্য তিনি ওই সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের জন্য তথ্য সংগ্রহই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। পুলিশ সাইফ রহমানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও তাঁর বক্তব্য যাচাই–বাছাই করে দেখছে।

বিজ্ঞাপন

সিটিটিসি সূত্র জানায়, সাইফ রহমানকে বহিষ্কারের ব্যাপারে ফরাসি কর্তৃপক্ষ আগেই বাংলাদেশকে জানিয়েছিল। সে দেশের পুলিশের একটি দল গত ১৪ জানুয়ারি তাঁকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত দিয়ে যায়। সেখান থেকে সিটিটিসি তাঁকে ৫৪ ধারায় আটক করে আদালতে পাঠায়। পুলিশ সাইফ রহমানকে আদালতে উপস্থাপন করে রিমান্ড প্রার্থনা করে। পাশাপাশি তাঁর সম্পর্কে ফরাসি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফরাসি ভাষায় লেখা যে নথি সরবরাহ করে, সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে অনুবাদের জন্য আবেদন করে।

অনুবাদ করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইফ রহমান ২০২০ সালে সন্ত্রাসী সংগঠন দায়েস–নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ভ্রমণ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাইফ রহমানের মধ্যে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রবণতা দেখা যায়। যেসব ‘উঠতি জিহাদি’ ইরাক-সিরিয়ায় যেতে পারেনি, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রায়ই তাদের উৎসাহিত করছে। বিভিন্ন দেশে তারা, বিশেষ করে দায়েসের মাধ্যমে, সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। ফ্রান্সে সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলা অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

ফরাসি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুবাদ করা ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্যারিসে রম্য সাময়িকী শার্লি এবদোর তৎকালীন কার্যালয়ের সামনে হামলা হয়। ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর কঁফ্লিয়-সান্ত অনোহিনে এবং ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর নিসে হামলা হয়। প্রতিবেদন বলছে, সাইফ রহমানও ফ্রান্সের মাটিতে সহিংস ঘটনা ঘটাতে পারেন।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলে, ‘বর্তমানে বিরাজমান ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের মাটিতে সাইফ রহমানের অবস্থান রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলার জন্য একটি বড় ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের হুমকি সৃষ্টি করেছে। তাই অতি দ্রুততার সঙ্গে যেকোনো সময় বড় কোনো সহিংস ঘটনা ঘটার ঝুঁকিকে আমলে নিয়ে তাঁকে এ দেশ থেকে বহিষ্কার করার আদেশ দেওয়া প্রয়োজন।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাইফ রহমান ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বাংলাদেশে বাস করেছেন এবং খুব সম্প্রতি ফ্রান্সে এসেছেন। তিনি অবিবাহিত এবং নিঃসন্তান। তাঁর মা–বাবা ফ্রান্সে বসবাস করলেও সাইফকে দেখতে তাঁরা বাংলাদেশে যেতে পারবেন। তাঁর বহিষ্কারাদেশ স্বাভাবিক, ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনসংক্রান্ত অধিকারকে ‘অস্বাভাবিকভাবে’ খর্ব করবে না।

অনুবাদ করা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পুলিশ ৫৪ ধারায় আটক সাইফ রহমানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে। এজাহারে সিটিটিসির কাউন্টার টেররিজম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, সাইফ রহমান বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে বিদেশে থেকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েসে যোগদানের চেষ্টা করেন। তিনি সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা নিয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেন। ফ্রান্সের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। তিনি ওই দেশের সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করেছেন এবং প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

সাইফ পরিস্থিতির শিকার, বললেন মা

সাইফ রহমান পরিস্থিতির শিকার বলে দাবি করেছেন তাঁর মা জিনাত রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামী লুৎফর রহমান ২০০১ সাল থেকে ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। ও লেভেল পরীক্ষার পর ২০১৫ সালে সাইফ তাঁর মায়ের সঙ্গে বাবার কাছে চলে যান। মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পরের বছর দেশ থেকে এ লেভেল পরীক্ষা দিয়ে ফ্রান্সের একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হন। তাঁর আর দুই সেমিস্টার পড়া বাকি ছিল। জিনাত বলেন, তাঁর ও ছেলের চার বছরের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর ১০ বছরের ভিসার জন্য সাক্ষাৎকার দিতে চিঠি পাঠানো হয় দুজনকেই। কাকতালীয়ভাবে ওই সময়েই ফ্রান্সে ‘ধর্ম নিরপেক্ষ মূল্যবোধ রক্ষায়’ নতুন আইন পাস হয় এবং ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। সাক্ষাৎকারের সময় তাঁর ছেলেকে ঢাকায় এমানুয়েল ম্যাখোঁর কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর ব্যাপারেও প্রশ্ন করা হয়।

জিনাতের দাবি, ফ্রান্সে উগ্রবাদে জড়ানোর সাজা অত্যন্ত কঠিন। তাঁর ছেলের সম্পৃক্ততা থাকলে ফ্রান্সেই বিচার হতো, বাংলাদেশে পাঠানো হতো না। তা ছাড়া বহিষ্কারাদেশের কাগজে তাঁর সঙ্গে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর যোগাযোগ আছে—এমন বলা হয়নি, ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। তাঁর জীবনযাপনের অধিকারও বাংলাদেশে অস্বাভাবিকভাবে ব্যাহত হবে না বলা হয়েছিল।

তবে পুলিশ বলছে, অতীতে বিদেশ থেকে উগ্রবাদে দীক্ষিতরা এদেশীয় উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে—এমন প্রমাণ আছে। পুলিশ সাইফ রহমানের সম্পৃক্ততা কতখানি তদন্ত করে দেখেই সিদ্ধান্ত দেবে।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন