বগুড়ায় রাত নামলেই মহাসড়কে পেট্রলবোমা আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত এক মাসে ৬৮ যানবাহনে পেট্রলবোমা হামলায় চারজন নিহত ও ১২ জন দগ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে শতাধিক। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩২টি। পুলিশ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বগুড়ার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) গাজিউর রহমান জানান, ২০-দলীয় জোটের অবরোধ শুরুর দুদিন আগে গত ৪ জানুয়ারি থেকেই বগুড়ায় নাশকতা শুরু হয়। এক মাসে ৫৮টি বাস-ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি পোড়ানো হয়েছে। পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন ১২ জন। নিহত হয়েছেন চারজন।

গাড়িচালক-শ্রমিক-মালিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের ওই হিসাবের বাইরে আরও ১০ থেকে ১২টি যানবাহন পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সও রয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যানের বাইরে দুর্বৃত্তদের হামলায় এক ট্রাকচালক নিহত হয়েছেন।

পরিবহনশ্রমিকদের দেওয়া তথ্যমতে, রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বগুড়ার চান্দাইকোনা সীমানা থেকে মোকামতলার রহবল পর্যন্ত ১৬টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব এলাকার মধ্যে মহিপুর, নয়মাইল, ফটকিব্রিজ, বনানী লিচুতলা, বগুড়া শহরতিলর মেডিকেল কলেজ-সিলিমপুর, বেলাইল, তিনমাথা, চারমাথা, নিশিন্দারা, ঝোপগাড়ি, বারপুর, মাটিডালি, গোকুল, মহাস্থান, চণ্ডীহারা ও রহবলে প্রতিরাতেই গাড়িতে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৪ জানুয়ারি রাতে শহরতিলর বারপুর এলাকায় আলুবাহী ট্রাকে হামলায় ট্রাকচালক পটল মিয়া, ২২ জানুয়ারি রাতে নুনগোলায় আসবাববাহী ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় চালক টিটন মিয়া, চালকের সহকারী আবদুর রহিম ও আসবাব ব্যবসায়ী সাজু মিয়া, ২৩ জানুয়ারি রাতে তিনমাথা এলাকায় ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় চালক মাসুদ মিয়া ও সহকারী জাহাঙ্গীর আলম, ৩১ জানুয়ারি রাতে নিশিন্দারা এলাকায় আলুবাহী ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় চালক সবুজ মিয়া ও আরোহী পোশাক কারখানার শ্রমিক সুরুজ মিয়া, ১ ফেব্রুয়ারি রাতে গোকুল এলাকায় আলুবাহী ট্রাকে হামলায় ব্যবসায়ী রেজাউল করিম ও ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনমাথা-বেলাইল এলাকায় পানবাহী ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় ট্রাকচালকের সহকারী ইমরান হোসেন, পান ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম ও মামুনুর রশীদ অগ্নিদগ্ধ হন। তাঁদের মধ্যে পান ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ ছাড়া আবদুর রহিম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ইমরান হোসেন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়া গত শনিবার রাতে হাসিবুর রহমান নামের আরেকজন নিহত হন।

তবে পুলিশের দেওয়া ওই তথ্যের বাইরে, ১০ জানুয়ারি রাতে চণ্ডীহারা এলাকায় পণ্যবাহী একটি ট্রাকে দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হন ট্রাকচালক ইমাদুর রহমান। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইমাদুর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা জানান, তাঁদের হাসপাতালে গত এক মাসে পেট্রলবোমার আগুনে পোড়া ও ককটেল বিস্ফোরণে আহত হয়ে অন্তত ২৫ জন ভর্তি হয়েছেন।

বগুড়া মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল লতিফ মণ্ডল জানান, হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন শ্রমিকেরা। রাতের বেলায় শ্রমিকদের মধ্যে পেট্রলবোমা আতঙ্ক বিরাজ করে বেশি। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন অনেকেই, কেউ প্রাণ বাঁচাতে গাড়ি থেকে লাফ দিতে গিয়েও আহত হয়েছেন।

বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে জানান, পুলিশি নিরাপত্তায় মহাসড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করছে। কিন্তু ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা চলন্ত গাড়িতে চোরাগোপ্তা পেট্রলবোমা হামলা ও নাশকতা চালিয়ে গা-ঢাকা দিচ্ছে। এসব নাশকতাকারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হামলা ঠেকাতে সার্বক্ষণিক পুলিশি টহল ছাড়াও মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রায় ৫০০ আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন