default-image

বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের উপনির্বাচনে গভীর রাতে টাকা ছড়ানোর অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াসির রহমতুল্লাহর (ট্রাক) বাবা ও পুলিশের সাবেক এক কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে সাত লাখ টাকা।

রোববার রাত দেড়টার দিকে সোনাতলা থানার সামনে রাস্তায় একটি মাইক্রোবাস তল্লাশি করে নৌকার কর্মী–সমর্থকেরা সাত লাখ টাকাসহ ওই পাঁচজনকে আটক করে প্রশাসন ও পুলিশকে খবর দেন। পরে সোনাতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শফিকুর আলম এবং সোনাতলা থানা পুলিশের কর্মকর্তারা গিয়ে সাত লাখ টাকা, ট্রাক প্রতীকের পোস্টার, হ্যান্ড বিল জব্দ করে এবং ওই পাঁচজনকে আটক করে থানা হেফাজতে নেন।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াসির রহমতুল্লাহর বাবা ইন্তেজার রহমান (৬৪) রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডির) সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে অবসরে যান তিনি। আটক অন্যরা হলেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী রোহান ফয়সাল (২৪), ফারদিন বিন রশিদ (২০), মিকানুল ইসলাম (২৬) ও মাইক্রোবাসের চালক জামাল হোসেন (৩০)।

সোনাতলার ইউএনও মো. শফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনে কালোটাকা ছড়ানোর চেষ্টার অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন-১৯৭২ অনুসারে নিয়মিত মামলার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোনাতলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মঙ্গলবার উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণকে সামনে রেখে আগে থেকেই টহল পুলিশের দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তৎপর ছিল। রোববার রাত আনুমানিক দেড়টায় সোনাতলা সদরের ঈশিতা ক্লিনিক ও ফিলিং স্টেশনের সামনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াসির রহমতুল্লাহর পক্ষে টাকা ছড়ানোর অভিযোগে ট্রাক প্রতীকের পোস্টার-লিফলেটসহ একটি মাইক্রোবাস আটক করেন নৌকার কর্মী–সমর্থকেরা। তাৎক্ষণিক সেখানে গিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাইক্রোবাসে থাকা ট্রাক প্রতীকের প্রার্থীর কর্মীদের কথাবার্তা অসংলগ্ন মনে হয়। তাঁরা বলেন, বগুড়া থেকে টাকা তুলে একটি কাজে সোনাতলায় এসেছিলেন। আবার বগুড়ায় ফিরছেন। কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হলে ইউএনও স্যার, ওসি স্যারসহ অন্যদের খবর দেওয়া হয়। তাঁরা এসে মাইক্রোবাস তল্লাশি চালিয়ে সাত লাখ টাকা, ট্রাক প্রতীকের পোস্টার, হ্যান্ড বিলস জব্দ করেন। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াসির রহমতুল্লাহর বাবাসহ পাঁচজনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। রোববার দুপুর পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।

জানতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াসির রহমতুল্লাহ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা। এখনো তিনি ওই বাহিনীতে সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। মধ্যরাতে ভোটারদের মধ্যে কালোটাকা ছড়ানোর অভিযোগ ভিত্তিহীন। প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল হিসেবে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে তাঁর বাবাকে ফাঁসানো হচ্ছে।

ইয়াসির রহমতুল্লাহ দাবি করেন, ‘বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করেছে। এ কারণে ভোটারদের বিপুল সমর্থন আমার প্রতি রয়েছে। ভোটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা যেন নিরপেক্ষ হয়, এ জন্য অনুরোধ করতে পুলিশের সাবেক একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমার বাবা সোনাতলা থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মাছউদ চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য রোববার দিনেরবেলা মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। ওসি তাঁর কার্যালয়ে দেখা করার জন্য রাত ১০টা সময় বেঁধে দেন। রোববার নির্বাচনী প্রচারণা শেষে রাত ১০টায় থানা চত্বরে মাইক্রোবাস রেখে বাবা ওসিকে ফোন দেন। তিনি বাবাকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বসিয়ে রাখেন। এ সময় নৌকার প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকেরা মাইক্রোবাস তল্লাশি করে পোস্টার ও টাকা পেয়ে হইচই করেন। পরে পুলিশ এসে বাবাসহ আমার কয়েকজন আত্মীয় ও চালককে আটক করে।’

রাতেরবেলা গাড়িতে সাত লাখ টাকা রাখার কারণ জানতে চাইলে ইয়াসির রহমতুল্লাহ দাবি করেন, সারিয়াকান্দির নারচিতে বাড়ি হলেও তাঁরা সপরিবারে বসবাস করেন ঢাকায়। রোববার অফিস খোলার পর ব্যক্তিগত প্রয়োজনেই বাবা বগুড়ার একটি ব্যাংক থেকে এ টাকা উত্তোলন করেন। শহরের একজন আত্মীয়ের বাসায় তিনি কয়েক দিন ধরে উঠেছেন। কিন্তু ভুল করে ওই বাসায় টাকা রেখে আসতে তিনি ভুলে যান। এ কারণে গাড়িতেই টাকা ছিল। তাঁর দাবি, টাকা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার মতো তাঁদের কোনো অর্থ নেই। তা ছাড়া অভিযোগ সত্যি হলে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের সময় হাতেনাতে ধরা হতো। ওসির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েই তাঁর বাবাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে ওসি আবদুল্লাহ আল মাছউদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাবা পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা হলেও তাঁকে আমি চিনি না। আগে কখনো পরিচয় হয়নি। ওসি হিসেবে অনেকেই দেখা করার জন্য ফোন দেন। তাঁকে থানায় আসতে বলেছি, তবে রাতে আসতে বলিনি। রাতে যখন দেখা করার কথা বলেন, তখন থানায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন। নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তা ছাড়া থানা চত্বরে তাঁর কোনো গাড়ি ছিল না। বাইরের রাস্তায় পেট্রলপাম্পের সামনে থেকে গাড়ি আটক করে তল্লাশি চালিয়ে ওই টাকা মিলেছে।’

নৌকার প্রার্থী সাহাদারা মান্নানের ছোট ভাই ও সোনাতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিনহাদুজ্জামান লীটন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নৌকার কর্মী–সমর্থকেরা নন, সাধারণ ভোটাররা স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাবাসহ কয়েকজন কর্মীকে সাত লাখ টাকাসহ উপজেলা সদর থেকে আটক করেছেন বলে শুনেছি।’

মঙ্গলবার সকাল নয়টা থেকে সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলায় একযোগে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সাংসদ আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদারা মান্নান (নৌকা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোকছেদুল আলম (লাঙ্গল), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী নজরুল ইসলাম (বটগাছ), বাংলাদেশ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের (পিডিপি) মো. রনি (বাঘ) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াসির রহমতুল্লাহ (ট্রাক)। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকির (ধানের শীষ) এই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

সোনাতলার ইউএনও শফিকুর আলম বলেন, এই উপজেলায় ৫৩টি কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণের জন্য ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য, প্রায় ৫০০ পুলিশ, ৬৩৬ জন আনসার সদস্য ছাড়া র‍্যাব-পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্টাইকিং ফোর্স, মোবাইল টিমসহ নানা স্তরে নিরাপত্তায় কাজ করছেন।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন পর্যন্ত তিন দফায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাংসদ হন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রয়াত নেতা আবদুল মান্নান। গত ১৮ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যুর কারণে আসনটি শূন্য হয়। নির্বাচন কমিশন ২৯ মার্চ ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করে তফসিল ঘোষণা করে। ৯ মার্চ প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে প্রচারণা শুরু করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।

মার্চে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় প্রার্থীদের প্রচারে ছেদ পড়ে। ২১ মার্চ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও বন্যার মধ্যে ১৪ জুলাই নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ায় বিএনপি এই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।

সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলা মিলিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৯৩ জন। এর মধ্যে সোনাতলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬৭ জন এবং সারিয়াকান্দি উপজেলায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩২৬ জন।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন