বাবার স্বীকৃতি ও ভরণপোষণ পাবে মাইমুনা (১০)। এ জন্য পৃথিবীর আলো দেখার পর থেকে অপেক্ষায় আছে সে। তার বাবা মাইনউদ্দিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক হিসেবে যশোর সেনানিবাসে ৩২ ইস্ট বেঙ্গলে কর্মরত। বর্তমানে কুয়েতে আছেন। তবে আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক। মাইনউদ্দিন আবার বিয়েও করেছেন। 
২০০৫ সালে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঝর্ণা আক্তারের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন মাইনউদ্দিন। এরপর প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া মেয়ের বাবার স্বীকৃতি আদায়ে মাইনউদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ঝর্ণা। গত ১২ নভেম্বর নেত্রকোনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ কে এম আবুল কাশেম এই মামলার রায় দেন। রায়ে মাইনউদ্দিনের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। আসামিকে পলাতক উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। রায়ে আরও বলা হয়, মাইমুনা তার মা অথবা মায়ের দিকের কোনো আত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে থাকবে। সে বাবা বা মা অথবা দুজনের পরিচয়ে পরিচিত হবে। তার ভরণপোষণের ব্যয় রাষ্ট্র বহন করবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যশোর সেনানিবাসের ৩২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শহীদুল আবেদীন আজ মঙ্গলবার টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাইনউদ্দিনের রায়ের কপি আমরা হাতে পেয়েছি। রায়ের কপি সেনা সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। মাইনউদ্দিন বর্তমানে কুয়েত সরকারের অধীনে কাজ করছেন। তাই তাঁকে ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। তাঁকে আইনের আওতায় আনার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের ঝর্ণা আক্তারকে ভালোবাসতেন তাঁর প্রতিবেশী মাইনউদ্দিন। কিন্তু এই সম্পর্ক বা তাঁর গর্ভবতী হওয়ার বিষয় ঝর্ণা গোপন করেন মাইনউদ্দিনের পরামর্শে। পরে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে গেলে গ্রাম্য সালিস বসে। সালিসে মাইনউদ্দিনের সঙ্গেই ঝর্ণার বিয়ে ঠিক হয়।
তবে ঝর্ণা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সালিসের পর বাড়িতে কাজি আইসা সাদা কাগজে সই নিছে। পরে কাবিননামা তুলে জানতে পারি মাইনউদ্দিনের বড় ভাই সুলতানের সঙ্গে বিয়ে পড়ানো হইছে।’ এদিকে ঝর্ণার মেয়ের জন্ম হয় ২০০৫ সালে। সে বছরেই আটপাড়া থানায় করা মামলায় সন্তানের পিতৃপরিচয় নির্ণয়ের জন্য নেত্রকোনার জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ আদালত (মামলা নং ৩৭ / ২০০৫) ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেন। ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে বলা হয় মাইনউদ্দিনই মাইমুনার বাবা। মাইমুনা বর্তমানে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। তার জন্মনিবন্ধন সনদ এবং স্কুলে ভর্তির সময়ও বাবার নাম হিসেবে মাইনউদ্দিনের নামই দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মেয়েকে নিয়ে কোনো রকমে টিকে আছেন ঝর্ণা। প্রতিনিয়ত তাঁকে সহ্য করতে হচ্ছে গ্রামের লোকের গঞ্জনা। ঝর্ণা বলেন, ‘আমার জীবন তো শেষ। মেয়ে বড় হইতাছে। এখন একটু একটু বুঝতে পারে। বাপ নিয়ে নানান কথা শুনে। আমি চাই ও তার বাবার পরিচয়ে বড় হউক।’
মাইনুদ্দিনের বড় ভাই সেলিম টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায়ের কপি হাতে পাইছি। সাত-আট দিন আগে ভাইয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হইছে। ও এখন কুয়েত মিশনে আছে। ভাই দেশে ফিরলেই এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করমু।’

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন