• মেয়েদের বয়স বেশি দেখিয়ে জন্মনিবন্ধনের সনদ সরবরাহের অভিযোগ।
• জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ গেছে।
• অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আজহারুল।
• তদন্ত না করে চেয়ারম্যানের গা বাঁচানোর অভিযোগ।

মেয়ের বাল্যবিবাহ দিতে চান, কিন্তু প্রশাসনের ঝামেলার ভয়ে আছেন? কোনো চিন্তা নেই। চেয়ারম্যানের কাছে গেলেই মিলবে প্রাপ্তবয়স্কের সনদ। অবশ্য এর জন্য আপনাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা হতে হবে।

ওই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আজহারুল হক স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের বয়স বেশি দেখিয়ে জন্মনিবন্ধনের সনদ সরবরাহ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা রাখার কথা। তাঁর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও গেছে।

তবে আজহারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত। আমি এ ধরনের কোনো সনদ দিইনি।’ বাল্যবিবাহের শিকার দুটি মেয়ের ক্ষেত্রে এমন সনদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার মনে নেই। তবে ইউপি সদস্য তাদের বিষয়ে হয়তো আমার কাছে মৌখিকভাবে সুপারিশ করেছিলেন।’

জেলা প্রশাসককে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গোয়ালনগর উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। টাকার বিনিময়ে তাদের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়স দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়েছেন চেয়ারম্যান আজহারুল। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলেও কোনো লাভ হয় না। কারণ চেয়ারম্যান কারও কথার তোয়াক্কা করেন না।

অভিযোগে বাল্যবিবাহ হয়েছে—এমন দুটি মেয়ের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হওয়া মেয়েটির আসল জন্মতারিখ ২০০২ সালের ২৫ নভেম্বর। কিন্তু ইউপি থেকে দেওয়া জন্মনিবন্ধন সনদে বয়স উল্লেখ করা হয় ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই। সপ্তম শ্রেণির মেয়েটির আসল জন্মতারিখ ১ জানুয়ারি ২০০৩। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যানের দেওয়া সনদে তা ১ জানুয়ারি ১৯৯৯ উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়ে দুটি ২০১৬ সালে বাল্যবিবাহের শিকার হয়। তখন তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৪ ও ১৩ বছর।

গোয়ালনগর উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সময়কার রেজিস্ট্রার ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার সনদ যাচাই করে মেয়ে দুটির আসল জন্মতারিখের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে প্রথম আলো। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা অনুযায়ী, অষ্টম শ্রেণির মেয়েটি সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল এবং সপ্তম শ্রেণির মেয়েটি ওই বছরের ৮ নভেম্বর পর্যন্ত বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল।

২৩ জানুয়ারি দুপুরে গোয়ালনগর উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায় বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তারেক মিয়াও অভিভাবক সদস্য আবুল কাশেমকে। কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কিরণ মিয়াও।

বাল্যবিবাহ প্রসঙ্গে তারেক মিয়া ও কিরণ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানের পক্ষে নির্বাচন করেছেন, তাঁরা চাইলেই নির্বিঘ্নে কিশোরী মেয়েদের বিয়ে দিতে পারেন। ১২ বছর বয়সের মেয়ের ১৮ বছর দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে দেন চেয়ারম্যান। এ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান টাকাও নেন।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে শুধু এই বিদ্যালয়েরই আটজন ছাত্রী ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। তাদের সবার জন্ম ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে। কিন্তু বিয়ের জন্য তাদের অভিভাবকেরা ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে যে সনদ আনেন, তাতে ১৮ বা তার বেশি বয়স দেখানো হয়।

বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য আবুল কাশেম বলেন, ‘ইউপি থেকে বেশি বয়স দেখানো জন্ম সনদ নিয়ে বাল্যবিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন ১০-১২টি মেয়ের নাম আমার কাছে রয়েছেআশপাশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামে খোঁজ নিলে সংখ্যাটা তিন-চারগুণ বাড়তে পারে। দুই বছর ধরে চেয়ারম্যান আজহারুল এমন জন্ম সনদ দিয়ে গ্রামের মেয়েদের বাল্যবিয়েতে সহায়তা করে চলেছেন।’

লোকদেখানো তদন্ত?

আবুল কাশেমের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টির তদন্ত শুরু করে। উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা জেসমিন আরা গত বছরের ডিসেম্বরে এবং উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন গত ১৭ জানুয়ারি গোয়ালনগর ইউনিয়নে যান। তবে এ দুই কর্মকর্তা তদন্ত না করে চেয়ারম্যানের গা বাঁচিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারী আবুল কাশেম বলেন, তদন্ত করতে এসে ওই দুই কর্মকর্তা ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছেন। তদন্তের ফলটা কেমন হবে তা তখনই বোঝা গেছে। তিনি আরও বলেন, ১৮ জানুয়ারি দুপুরে তিনি মেয়ে দুটির আসল জন্ম তারিখের সপক্ষে কাগজপত্র দিতে যান উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার দপ্তরে। কিন্তু সময় শেষ এমন কথা বলে তিনি তাঁকে ফিরিয়ে দেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুই কর্মকর্তা। জেসমিন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা তদন্ত প্রতিবেদন ইউএনওর কাছে জমা দিয়েছেন। চেয়ারম্যানকে বাঁচাতে মিথ্যা প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে এলাকাবাসী অভিযোগ তুলছেন এমন প্রশ্ন করতেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি আর ধরেননি।

নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত আলী বলেন, দুই কর্মকর্তা তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাননি। তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজনে আবার তদন্ত করা হবে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন