মৌলভীবাজারের নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন হিট ব্যাকের’ পর উদ্ধার হওয়া সাতটি লাশের মধ্যে চারটিই শিশু। এর মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুর বয়স কয়েক মাস বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা। শিশুটি এমনভাবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যে সে ছেলে না মেয়ে তা বোঝা যাচ্ছে না।
জঙ্গি সন্দেহে গত বুধবার ভোর থেকে টানা ৩৪ ঘণ্টা ঘিরে রেখে অভিযান চালানোর পর গত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের নাসিরনগরের ওই বাসা থেকে সাতটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা, বুধবার বিকেলেই আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এরা নিহত হয়।
গতকাল শুক্রবার নিহত সাতজনের ময়নাতদন্ত হয়েছে। বিস্ফোরণে এদের সবার মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া আরও তিনটি মেয়েশিশু, দুই নারী ও এক পুরুষের লাশ রয়েছে। বিস্ফোরণে প্রাপ্তবয়স্ক তিন নারী-পুরুষের শরীরের মধ্যভাগ একেবারেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
নাসিরপুরের ওই জঙ্গি আস্তানার আশপাশের বাসিন্দারা জানান, ওই বাড়িতে চারটি শিশুসহ আটজন থাকতেন। জঙ্গিদের পাশের ঘরের বাসিন্দা এক রিকশাচালক বলেন, একজন বয়স্ক ব্যক্তি, তাঁর স্ত্রী, পাঁচ মেয়ে ও বড় মেয়ের জামাই এখানে থাকত।
ছোট চারটি মেয়ে একেবারেই শিশু। তাদের তিনজনকে মাঝে মাঝে বাড়ির আঙিনায় খেলতে দেখা যেত। সাত ও দশ বছর বয়সী শিশু দুটিও বোরকা পরত। কোলে বাচ্চা নিয়ে বয়স্ক লোকটিও মাঝে মাঝে মেয়েদের সঙ্গে খেলতেন।
পুলিশ ধারণা করছে, বয়স্ক লোকটির বড় মেয়ের স্বামীর নাম সোহেল রানা। তিনি নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে বয়স্ক লোকটির লাশ পাওয়া যায়নি। নিহত সোহেলের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে বলে পুলিশের কর্মকর্তারা জানান। তবে নিহত ব্যক্তিদের বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য পুলিশের কর্মকর্তারা দিতে পারেননি। পুলিশ বলেছে, সোহেল বান্দরবান এলাকায় অবস্থান করে নব্য জেএমবির জন্য সদস্য সংগ্রহ করেছিলেন। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন সোহেলের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।
অপারেশন হিট ব্যাক শেষে বৃহস্পতিবার পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, বুধবার বিকেলে সোয়াটের অভিযান শুরুর আগেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শিশুদের নিয়ে পরিবারটি আত্মঘাতী হয়। তবে এরপরও বুধবার সন্ধ্যায় ও বৃহস্পতিবার ওই বাড়িটি লক্ষ্য করে প্রচুর গুলি ছোড়ে সোয়াট।
বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার দিনে বাড়িটি লক্ষ্য করে এত গুলি করা হলো কেন জানতে চাইলে মনিরুল বলেন, এটি সোয়াটের অভিযান পরিচালনার কৌশল। তাদের যে এসওপি, ট্রেনিং ম্যানুয়াল, সেগুলো অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করে। যেহেতু নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না, তাই এটা হতেই পারে। এটা ‘ট্যাকটিকাল’ বিষয়, বেশি প্রশ্ন না করাই ভালো।
এদিকে গতকাল বেলা পৌনে তিনটার দিকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন পৌঁছায়। এরপরই তিন সদস্যের বোর্ড ময়নাতদন্ত করে। বোর্ডের সদস্যরা হলেন সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট সুব্রত কুমার রায়, জুনিয়র কনসালট্যান্ট আবু ইমরান ও আরএমও পলাশ রায়। বিকেল পাঁচটায় ময়নাতদন্ত শেষ হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক পার্থ সারথী দত্ত কানুনগো সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ছিন্নভিন্ন লাশের যেসব অংশ এসেছে, তা ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। চারটি শিশুর মধ্যে একটির বয়স কয়েক মাস। বাকি তিনটি মেয়ে শিশু। এদের মধ্যে একটি ২ বছরের, আরেকটি ৭ ও অন্যটি ১০ বছরের। আর নারী দুজনের একজনের বয়স আনুমানিক ২০-২৫ ও অপরজনের ৩৫ বছর। পুরুষটির বয়সও ৩৫ বছরের মধ্যে।
পার্থ সারথী আরও বলেন, লাশগুলোতে মোটা তারের টুকরোর মতো ধাতব বস্তু পাওয়া গেছে। এখানে আনার দু-এক দিন আগেই তাদের মৃত্যু হয় বলে মনে হচ্ছে। পচনও ধরেছে, তবে তাদের চেহারা বোঝা যাচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক তিনজনের পেটের অংশের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য প্রতিটি লাশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন