default-image

নেহার বানুর বিয়ে হয়েছিল দেশ স্বাধীনের পরের বছর। শ্বশুরবাড়ি নদীর পাড়ে। নদীতে তিনি গোসল করতেন। মাছ ধরতেন। বাড়িতে পোষা হাঁসের জন্য শামুক তুলতেন। ধীরে ধীরে বাঁধ পড়ল নদীতে। মাছ চাষ শুরু হলো। স্মৃতিময় বেতনা নদীতে নামাই তাঁদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।

চোখের সামনে এই পরিবর্তন মানতে পারছেন না ষাটোর্ধ্ব নেহার বানু। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর ২০ বছর নদীটি বেঁচে ছিল। আস্তে আস্তে নদীটি দখল হয়ে গেছে। এখন নদীর বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দিয়ে খণ্ড খণ্ড পুকুর বানিয়ে সেখানে মাছ চাষ হয়। পানি আনতাম। নৌকায় চড়তাম। কত স্মৃতি। আর এখন নদীতে নামলে মারধর করে। ভয়ে নামি না।’

প্রভাবশালীরা নদী দখল করে মাছের ঘের করায় নেহার বানুর মতো যশোরের ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর পাড়ের মানুষ নদীর পানি ব্যবহার করতে পারেন না। নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত না হওয়ায় উপজেলা দুটির অন্তত ৩০ গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়। বর্ষা মৌসুমে ফসল হয় না অন্তত ১০টি বিলে।

বেতনা নদীর অন্য নাম বেগবতী বা বেত্রবতী। শার্শার মানুষের কাছে নদীটি বেতনা নামে ও ঝিকরগাছার মানুষের কাছে ভায়না নদী নামে। ঝিনাইদহের মহেশপুর সদরের পাশে কালিবাড়ী এলাকা থেকে ভৈরব নদ থেকে বেতনার উৎপত্তি। সেখান থেকে দক্ষিণে মহেশপুর উপজেলার গোপালপুর এলাকা দিয়ে নদীটি ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করেছে। পুনরায় বেতনা ভারতের মোস্তফাপুর এলাকা দিয়ে শার্শার লক্ষ্মণপুর ইউনিয়নের শিকারপুর এলাকা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর নদীটি উপজেলার নারকেলবাড়িয়া, ফুলসাইরা, ডিহি, শুড়া, তেবাড়িয়া, গৌড়পাড়া, বনমান্দার ও কন্দর্পপুর হয়ে ঝিকরগাছা উপজেলায় শিমুলিয়া ইউনিয়নে পড়েছে। কিছুটা পূর্ব দিকে এগিয়ে উপজেলার রাধানগর এলাকায় নদীটি জিয়া খালের সঙ্গে মিশেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শার্শার শিকারপুর থেকে গৌড়পাড়া পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটারে পানি আছে। গোড়পাড়া থেকে বনমান্দার এলাকা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার মৃত। এই অংশে চাষাবাদ হয়। আবার বনমান্দার এলাকা থেকে রাধানগর এলাকার জিয়া খাল পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার বেশ চওড়া। এই অংশে অন্তত আটটি বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে।

নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, কন্দর্পপুর থেকে ভায়না বটতলা পর্যন্ত নদীর মধ্যে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন শার্শা উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও শার্শা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন। পরের অংশে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন ভায়নাপাড়া গ্রামের লোকজন। এরপরের অংশ দখলে রয়েছে ঝিকরগাছা উপজেলার রাজাপুর গ্রামের প্রয়াত লোকমান হোসেনের পরিবারের। তাঁদের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছেন রাধানগর গ্রামের লিটন হোসেন। এরপর নদী দখলে নিয়েছেন রাজাপুর গ্রামের কামাল হোসেন। সেখান থেকে জিয়া খালে নদীর পতিত মুখ পর্যন্ত তিনটি আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন রাজাপুর গ্রামের লোকমান হোসেন ও তাঁর শ্যালক হুমায়ুন কবির।

নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, অন্তত ৩০টি গ্রাম এবং ১০টি বিলের পানি এই নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হতো। নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় পানিনিষ্কাশনে বাধার কারণে জলাবদ্ধতায় সৃষ্টি হয়। বিলগুলোতে বর্ষা মৌসুমে পানি থাকে। বর্ষা শেষ হলোও পানি সরে না। সেচে কিছু পানি সরিয়ে কিছু অংশে একটি ফসল করেন চাষিরা।

শার্শা উপজেলার কন্দর্পপুর গ্রামের কৃষক আসগর আলী (৪৫) বলেন, ‘উন্মুক্ত নদীতে অনেক মাছ ছিল। নদীতে নেমে মাছ ধরতাম। ২০ বছর নামতে পারি না। নদী দখল করে সোহরাব চেয়ারম্যান মাছ চাষ করছেন।’ একই গ্রামের মো. রকিব উদ্দীন বলেন, ‘ভায়নার বিল এবং বনমান্দারের বিলে আমাদের ১৬ বিঘা জমি আছে। জমিতে আগে দুই ফসল হতো। নদী বেঁধে মাছ চাষ করায় বর্ষাকালে জলাবদ্ধ থাকে। এতে বিলে আমন ধান হয় না। শুধু শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান হয়।’

তবে দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে লোকমান হোসেনবলেন, ‘রাধানগর মৌজায় ওই জমির মালিক ছিলেন নূর মোহাম্মদ, দিদার বক্স মণ্ডল, কুরবান আলী দফাদার ও আবদুর রউফ। তাঁদের কাছ থেকে আমি জমি কিনেছি। এই জমি নদীর নয়, ধানি জমি।’ কামাল হোসেন বলেন, ‘ক্রয়সূত্রে আমার জমি ৪৪ শতক। নদীরও কিছু জায়গা আমার মধ্যে আছে। আমার জমির দুই পাশে অন্য লোক বাঁধ দিয়েছে। এই জন্য আমার জমিটি ঘেরের মতো দেখায়। তবে সেখানে আমি মাছ চাষ করি না।’

চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বলেন, ‘সরকার ভূমিহীনদের ওই জমি দলিল করে দিয়েছিল। ৩০ বছর আগে আমরা ভূমিহীনদের কাছ থেকে ২৫ বিঘা জমি কিনেছি। তবে ওই জমি কখনো নদীর জমি ছিল কি না আমি জানি না।’

শিমুলিয়া ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা নিসার উদ্দীন আল আজাদ বলেন, নদীর জায়গা কোনো অবস্থাতেই বন্দোবস্তযোগ্য নয়। ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হওয়ারও সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে তদন্ত করা হয়েছে। ওই জমি সরকারি খতিয়ানে ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যক্রম শুরু করা হবে। শার্শার সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা জরিপ শুরু করেছি। দখলদারদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। জরিপ শেষে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0