যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বিএনপির দুই কর্মী নিহত হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ দুজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে। 
একই রাতে রাজশাহী নগরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে শিবিরের ক্যাডার’ আহত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আহত হয়েছেন যুবদলের এক নেতা।
যশোরে দুজন নিহত: মনিরামপুর উপজেলার ব্যাগারিতলা এলাকায় রাত দুইটার দিকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন আবু সাঈদ (৪০) ও বজলুর রহমান (৪০)। তাঁদের বাড়ি একই উপজেলার জয়পুর গ্রামে।
মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোল্লা খবির আহমেদের ভাষ্য, মঙ্গলবার বিকেলে র্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযানে আটক হন সাঈদ ও বজলুর। দুজনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তাঁদের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য রাত আড়াইটার দিকে উপজেলার ব্যাগারিতলা এলাকায় যায়। এ সময় বজলুর ও সাঈদের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এর একপর্যায়ে তাঁরা দুজন গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করে মনিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন।
ওসির দাবি, ঘটনাস্থল থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র, দুটি গুলি, ১২টি পেট্রলবোমা ও নয়টি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত দুই ব্যক্তি ২০১৩ সালে জয়পুর গ্রামে সংঘটিত নাশকতার ঘটনায় করা আটটি মামলার আসামি ছিলেন।
ওসি জানান, ময়নাতদন্তের জন্য লাশ দুটি যশোর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
নিহত বজলুরের ভাই মো. রবিউল জানান, বজলুর একজন পল্লিচিকিৎসক। জয়পুরের গোপেরবাজারে তাঁর ওষুধের দোকান আছে। তিনি বিএনপির রাজনীতি করতেন। মঙ্গলবার বিকেলে ওষুধের দোকান থেকে বজলুর ও সাঈদকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। সন্ধ্যায় পরিবারের লোকজন তাঁর সঙ্গে থানায় দেখা করেন। কাল সকালে তাঁরা জানতে পারেন ব্যাগারিতলায় বন্দুকযুদ্ধে দুজন নিহত হয়েছেন। সেখানে গিয়ে তাঁরা লাশ শনাক্ত করেন। রবিউল অভিযোগ করেন, তাঁর ভাইকে আসলে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পৌরসভার মেয়র শহিদ ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, চোর-ডাকাত-অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর বিএনপির নিরীহ দুই কর্মীকে ধরে পুলিশ ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে।
রাজশাহীতে শিবির কর্মী আহত: রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়ায় গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জনি ইসলাম (২০) নামের এক শিবির কর্মী আহত হন। জনি নগরের বিনোদপুর এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি স্থানীয় ইসলামিয়া কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। পুলিশের দাবি, জনি শিবিরের ‘দুর্ধর্ষ ক্যাডার’। তাঁর বিরুদ্ধে নাশকতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম জানান, গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে নগরের বিনোদপুর বাজারে মহানগর ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান ওরফে ইয়ামিন ও রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সদস্য ইসতিয়াক আহাম্মদ ওরফে ইশাকে গুলি করে ও কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিনোদপুর এলাকা থেকে রাত ১১টার দিকে জনিকে আটক করে। ইফতে খায়ের আলমের ভাষ্য, জনিকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর সহযোগীদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। রাতে জনির সহযোগীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের জন্য পুলিশ তাঁকে নিয়ে বের হয়। রাত দুইটার দিকে নগরের রাজপাড়া থানার তেরখাদিয়া এলাকার ডাবতলায় গেলে জনির সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে অন্তত আটটি ককটেল ছোড়ে ও গুলি চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় জনি দৌড়ে পালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝে পড়ে জনি আহত হন। তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচে গুলি লাগে। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।
মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম আরও জানান, জনির নেতৃত্বেই বড় বড় হামলা ও নাশকতার ঘটনা ঘটে।
গতকাল সন্ধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, জনিকে ‘অস্ত্রোপচার-পরবর্তী কক্ষে’ রাখা হয়েছে। তাই তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। এ সময় হাসপাতালে জনির কোনো স্বজন ছিলেন না।
লক্ষ্মীপুরে আহত যুবদল নেতা: লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ হামছাদী ইউনিয়নের পালেরহাটে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম ওরফে জসিম (৩২) আহত হন। তবে নজরুলের অভিযোগ, পুলিশ তাঁর পায়ে গুলি করেছে। তাঁকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) নাসিম মিয়ার ভাষ্য, নাশকতার মামলার আসামি নজরুলকে মঙ্গলবার রাতে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পথে রাত তিনটার দিকে নজরুলের সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিও চালায় তারা। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এ সময় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে নজরুলের পায়ে গুলি লাগে। তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধে পুলিশের তিন সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নজরুল সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, গভীর রাতে সাদাপোশাকের পুলিশ তাঁকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসে। একপর্যায়ে পালেরহাট এলাকায় নিয়ে গিয়ে তাঁর পায়ে গুলি করে। নজরুল দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে থানায় মামলা বা কোনো ধরনের অভিযোগ নেই। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন তিনি।
নজরুলের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুর রহমান।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী; যশোর অফিস ও লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি}

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন