default-image

অপহরণের কাজে যে মাইক্রোবাসটি ব্যবহার করেন র‌্যাব সদস্যরা, সেটি পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। চালকের সঙ্গে চুক্তি ছিল, সকাল ১০টার দিকে আসতে হবে র‌্যাব সদর দপ্তরের কাছে। কয়েকজন বন্ধু মিলে বসুন্ধরার ৩০০ ফিটের দিকে ঘুরতে যাবেন, এটুকুই বলা হয়েছিল তাঁকে। তবে মাইক্রোবাস চালাতে গিয়ে ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, গাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে আসলে কাউকে অপহরণ করতে।

মাইক্রোবাসের চালক সুমন মিয়া গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে এসব কথা বলেছেন। তিনি আরও জানান, গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় উত্তরার র‌্যাব সদর দপ্তরের পাশ থেকে র‌্যাবের পোশাক পরা পাঁচজন এবং লাল টি-শার্ট পরিহিত রনি (করপোরাল) তাঁর মাইক্রোবাসে ওঠেন। এরপর রাত সাড়ে ১০টায় রাজধানীর হাতিরঝিলে পুলিশের হাতে আটক হওয়া পর্যন্ত অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির পুরো ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এরপর গত রোববার আদালতে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি জবানবন্দি দেন।

বিজ্ঞাপন
মাইক্রোবাস চালাতে গিয়ে ধীরে ধীরে সুমন মিয়া বুঝতে পারেন, গাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে আসলে কাউকে অপহরণ করতে।

হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দা তামজিদ হোসেনকে অপহরণের পর পরিবারের কাছ মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পুলিশ তিন র‌্যাব সদস্য, বিমানবাহিনীর এক করপোরাল এবং এক নারীকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় করা মামলার আসামিরা হলেন র‌্যাব সদর দপ্তরের অপারেশন উইংয়ে কর্মরত ল্যান্স করপোরাল দুলাল মৃধা, ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে কর্মরত সৈনিক মো. রোকন মিয়া, তদন্ত ও ফরেনসিক বিভাগে কর্মরত সৈনিক মো. সাগর, বিমানবাহিনীর ল্যান্স করপোরাল মো. রনি এবং বাগেরহাটের শরণখোলার বাসিন্দা রানু বেগম।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, অপহরণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত র‌্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সৈনিক রাকিব, অপারেশন উইংয়ের সেপাই মোবারক এবং রাকিব নামের আরও এক ব্যক্তি এখনো পলাতক।

অপহরণের বিষয়ে মাইক্রোবাসের চালক সুমন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মাস দুয়েক আগে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিমানবাহিনীর করপোরাল মো. রনির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই দিন রনি তাঁকে চা খাওয়ান, গল্প করেন এবং যাওয়ার সময় মুঠোফোন নম্বর নিয়ে যান। এরপর আর যোগাযোগ ছিল না। গত বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে হঠাৎ রনি তাঁকে ফোন করেন। তখনই মাইক্রোবাস ভাড়ার বিষয়টি ঠিক হয়। সুমন মিয়া বলেন, পরদিন (বৃহস্পতিবার) সকাল পৌনে ১০টায় তিনি পূর্বনির্ধারিত জায়গায় পৌঁছান। ১০টার দিকে প্রথমে রনি এসে গাড়িতে ওঠেন। এর কিছুক্ষণ পরই র‌্যাবের পোশাক পরে আরও পাঁচজন ওঠেন।

সুমন জানান, তাঁকে রাজলক্ষ্মী মার্কেটের পেছনে নিউ ভিআইপি রেস্টুরেন্টে যেতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর তিনি ছাড়া অন্যরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে যান। দু-তিন মিনিট পর সেখান থেকে তাঁরা বেরিয়ে আসেন। সঙ্গে ছিলেন আরও চারজন (এক নারীও ছিলেন)। মাইক্রোবাসে ওঠার পর দুজনের হাতে হাতকড়া পরানো হয় এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা হয়। পরে তিনি ওই দুজনের নাম তামজিদ ও ইকবাল বলে জেনেছেন। তিনি মাইক্রোবাস চালানো শুরু করার পরই ওই দুজনকে মারধর শুরু করা হয় এবং ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে বলে ভয় দেখানো হয়। তাঁদের কথা তিনি শুনছিলেন।

একপর্যায়ে র‌্যাবের সদস্যরা সুমনকে বসুন্ধরার ৩০০ ফিটের দিকে যেতে বলেন। সেখানে পৌঁছার পর চারজন র‌্যাব সদস্য, ওই নারী (রানু) এবং আরও একজন (রাকিব) নেমে যান। মাইক্রোবাস তখন প্রায় ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর ওই ছয়জন আবার ফিরে এসে গাড়িতে ওঠেন এবং তাঁকে গাড়ি চালাতে বলা হয়, কিন্তু কোথায় যাবেন সেটি কেউ বলেননি। একপর্যায়ে তিনি শুনতে পান, রানু ফোনে কাউকে দুই কোটি টাকা দিতে বলেন এবং নানা কথা চলতে থাকে।

সুমন জানান, র‌্যাবের সদস্যরা কথাবার্তার একপর্যায়ে তামজিদকে মিডিয়ার সামনে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপনের হুমকি দেন। ঠিক তখনই একটি বেসরকারি টেলিভিশনের গাড়ি তাঁদের মাইক্রোবাসের পেছনে ছিল। ওই সময় তামজিদের নখও তুলে ফেলার হুমকি দেন তাঁরা। পুরোটা সময় তিনি ৩০০ ফিট এলাকার ভেতরে নির্জন বিভিন্ন সড়ক, রূপগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় মাইক্রোবাস চালাচ্ছিলেন। সন্ধ্যার দিকে দুজন র‌্যাব সদস্য (রনি ও রোকন) গাড়ি থেকে নামেন তামজিদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা আনতে। তখন তাঁরা কুড়িল বিশ্বরোডের পাশে ৩০০ ফিটের মাথায় অবস্থান করেন। এর কিছুক্ষণ পরই রনি ও রোকন ধরা পড়ে গেছেন বলে র‌্যাব সদস্যদের কাছে তথ্য আসে। তখন মাইক্রোবাসটি র‌্যাব সদর দপ্তরের দিকে নিয়ে যেতে বলা হয় তাঁকে। তিনি সদর দপ্তরের কাছে বাউনিয়া যাওয়ার রাস্তার দিকে একটি লেগুনা স্ট্যান্ডে দাঁড়ান। সেখানে গাড়ি থেকে তিনজন নেমে যান। এরপর তাঁকে হাতিরঝিলের দিকে যেতে বলা হয়। মধুবাগ ব্রিজের ওপর আসার পরপরই পুলিশ তাঁদের আটক করে।

বিজ্ঞাপন

র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান। র‌্যাবের আরও যে দুজন পলাতক রয়েছেন বলে বলা হচ্ছে। তাঁরা র‌্যাবের সদস্য, না সাধারণ মানুষ, তা তদন্তের পর জানা যাবে।

পুলিশ জানায়, তামজিদের বোনের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা আনতে যান দুজন। তাঁদের একজন রনি অন্যজন রোকন। তাঁরা ৩০০ ফিট এলাকায় মাইক্রোবাস থেকে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় যান। সেখানে তামজিদের বোন রাইয়ানা হোসেন অপেক্ষা করছিলেন। ওই দুজন যে অটোরিকশা ব্যবহার করেছিলেন সেই অটোরিকশার চালক আইয়ুব আলীও রোববার জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া তামজিদের সঙ্গে অপহৃত হওয়া তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ ইকবাল হোসেনও পুরো ঘটনার বর্ণনা আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে (রোববার) উল্লেখ করেছেন।

এদিকে অপহরণকারী র‌্যাব সদস্যদের সহযোগী রানু বেগম দুই দিনের রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শেষে গতকাল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এরপর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পুলিশ বলছে, রানুসহ ওই র‌্যাব সদস্যরা একই চক্রের সদস্য।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন