default-image

পুরোটাই সবুজ। যেন বঙ্গোপসাগর থেকে একটি সবুজ গালিচা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কাদামাটি ঢেকে দিয়েছে। মাঝে মাঝে সাপের মতো আঁকাবাঁকা নদী, খাল আর খাঁড়ি। আকাশ থেকে সুন্দরবনের এই দৃশ্য যখন দেখা যাচ্ছিল, তখনই সবুজ বনে লালচে মরিচা রঙে চোখ আটকে গেল। সঙ্গে থাকা বন কর্মকর্তা বললেন, এটিই সুন্দরবনের আগুনে পোড়া এলাকা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন আর বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের নতুন ক্ষত।
গত এক মাসে সুন্দরবনের নাংলী বন ফাঁড়ির পাশে ভোলা নদীর তীরে বনভূমিতে আগুন দেওয়া হয়। এবারের আগুন সবার নজরে এলেও বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের হিসাবে, পূর্ব সুন্দরবনের এই এলাকায় গত দুই বছরে ১৪ বার আগুন দেওয়া হয়েছে। আর গত এক মাসে আগুন লাগানো হয়েছে চারবার। সুন্দরবনের সংরক্ষিত এই এলাকায় কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ।
বন বিভাগের হিসাবে, গত এক মাসে আগুনে পুড়েছে প্রায় ১৩ একর বনভূমি। তবে স্থানীয় ব্যক্তিদের মতে, পুড়েছে ২০ থেকে ২৫ একর। এই আগুন দেওয়ার কারণ অনুসন্ধানে বন বিভাগ এবং শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের এই অংশে বর্ষায় মাছ ধরার জন্য আগুন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষায় জলাশয়ে রূপ নেওয়া ওই এলাকায় মাছ আটকাতে বনে আগুন দেওয়া হয়।

পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার। আগুন লেগেছে মাত্র কয়েক একর এলাকায়। তবে যত ছোট এলাকাতেই আগুন লাগুক না কেন, আমরা ওই আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এনেছি। যারা আগুন দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়েছি।’

আগুন দেওয়ার ঘটনায় ১০ জনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেছে বন বিভাগ। প্রধান আসামি করা হয়েছে শরণখোলার রায়েন্দা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহজাহান হাওলাদারকে। তাঁকে এলাকাবাসী শাহজাহান শিকারি নামেই চেনে। সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ, পাখি, সাপসহ নানা বন্য প্রাণী শিকারে সিদ্ধহস্ত হওয়ায় এলাকাবাসী তাঁকে এ নামে ডাকে।

শরণখোলা থানার ওসি মো. শাহ আলম মিয়া গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ওই তিন মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শাহজাহানসহ বাকিরা পলাতক। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের  সাংসদ (বাগেরহাট-৪) মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘বরিশাল থেকে আসা লোকজন এবং স্থানীয় কিছু মানুষ গাছ চুরিসহ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত। যারা এ কাজ করেছে, তারা আমাদের দলের বা দলের বাইরের যে-ই হোক, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।’

সুন্দরবনের এই অংশে আগুন দেওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল সুন্দরবনের প্রায় ৫০০ একর এলাকাকে মাছের ঘের বানানোর পরিকল্পনার কথা। বনের বৃক্ষরাজি উজাড় করে তা মাছের ঘেরে পরিণত করার এই তৎপরতা চলছে ১৪ বছর ধরে।

শরণখোলার বেশ কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি ও জেলেদের সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁরা বলেন, ভোলা নদীর পাশে পূর্ব সুন্দরবনের ধানসাগর অংশটির পাড় কিছুটা উঁচু। আর ভেতরের দিকটি কিছুটা ঢালু, অনেকটা থালার মতো। বর্ষাকালে ওই এলাকা বড় বিলে রূপ নেয়। শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের লোকালয় সন্নিহিত বনাঞ্চলে এ রকম ২২টি স্থান আছে। যেগুলো বর্ষায় হয় মাছের আশ্রয়স্থল। স্থানীয় ব্যক্তিরা বর্ষাকালীন এসব জলাশয়ে মাছ ধরে। কিন্তু মাছ ধরার ক্ষেত্রে বড় ‘বাধা’ বৃক্ষরাজি। তাই প্রতিবছর বর্ষার আগে স্থানীয় ব্যক্তিরা সেখানকার গাছ ও লতাগুল্মে আগুন লাগিয়ে মাছের এই ‘প্রাকৃতিক ঘের’ সম্প্রসারণ করে।

তবে শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর থেকে এই আগুন লাগানোর প্রভাব নিয়ে করা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন কেটে ন্যাড়া করার ফলে পাখিসহ জলজ ও উভচর প্রাণীর প্রজননক্ষেত্র আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। গোলগাছের পাতা ও মূল কেটে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে, যাতে নতুন করে গোলগাছ জন্ম নিতে না পারে। নির্বিচারে আহরণের কারণে কাঁকড়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এ ছাড়া ডলফিন, কুমিরসহ জলজ প্রাণীর একটা বড় অংশ বিলুপ্ত হতে চলেছে।

প্রতিবেদনে আগামী পাঁচ বছর সুন্দরবন থেকে সব ধরনের মাছ ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী বলেন, ‘যারা সুন্দরবনে আগুন দিয়েছে, তারা যত প্রভাবশালী হোক না কেন, আমরা তাদের ছাড়ব না। এ ধরনের তৎপরতা যাতে ভবিষ্যতে আর না হয়, সে জন্য আমরা বিষয়টিকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করব।’

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন