default-image

ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশের লোকজনের বিদেশে পাড়ি দেওয়া থামছে না। ভাগ্য বদলাতে অনেকে দেশ-বিদেশি মানব পাচারকারীদের প্রলোভনের শিকার হচ্ছেন। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশিদের নাম বারবার আসছে।

বিপজ্জনক পথে মানব পাচার যে বন্ধ হয়নি, তার সর্বশেষ উদাহরণ লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়া বাংলাদেশের লোকজনের নৌকাডুবির ঘটনা। গত বৃহস্পতিবারের তিউনিসিয়ার উপকূলে ভূমধ্যসাগরে ওই ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ৩৯ বাংলাদেশির নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে।

গতকাল বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন তাঁর দপ্তরে সাংবাদিকদের জানান, নৌকাডুবিতে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশের ১৪ যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিখোঁজ লোকজন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছেন। যে চারজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তাঁদের একজন বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি হলেন শরীয়তপুরের নড়িয়ার উত্তম কুমার দাস। তিনি গৌতম দাসের ছেলে। ছবি পাঠিয়ে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে উত্তম কুমারের পরিচয়ের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া নিখোঁজ ৩৯ জন বাংলাদেশির মধ্যে ২২ জন হচ্ছেন বৃহত্তর সিলেটের অধিবাসী। মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত নোয়াখালীর তিন ভাইয়ের একটি চক্র ও মাদারীপুরের দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ছাড়া বৃহত্তর সিলেট থেকে যাঁরা গেছেন, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বেশ কিছু দালালকে চিহ্নিত করেছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া ১৪ বাংলাদেশি মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত নোয়াখালীর তিন ভাইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন রোম্মান, রিপন ও রুবেল। তাঁদের একটি শক্তিশালী চক্র রয়েছে লিবিয়া আর তুরস্কে। আর মাদারীপুরের দুজনের নাম নুরী ও মিরাজ বলে জানা গেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার দুই ঘণ্টা পর গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে তিউনিসিয়ার উপকূলে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশের লোকজনের হতাহতের প্রসঙ্গে আলোচনা হয়।

বৈঠকের পর সংসদীয় কমিটির সভাপতি ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে সমস্যার উপায় খুঁজে বের করতে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে আলোচনায় বসার সুপারিশ করা হয়েছে। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির শিকার হওয়া লোকজন কাদের মাধ্যমে গেছে, সেটা খুঁজে বের করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তা না হলে এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

২০১৮ সালের অক্টোবরে মেক্সিকোর দুর্গম পথে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি আটক হন। তাঁদের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস–এর গত বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছাতে আগ্রহী অবৈধ অভিবাসীদের দুবাই থেকে ব্রাজিলে নেওয়া হয়। এরপর বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, পানামা সিটি আর গুয়াতেমালা হয়ে নেওয়া হয় মেক্সিকোতে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে আটক করা হয় ১৯২ জন বাংলাদেশিকে। তাঁদের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথটি হচ্ছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ওই পথ দিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় প্রতি ৫০ জনের ১ জন মারা গেছে। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অন্তত ১৭ হাজার অবৈধ অভিবাসী ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে ঢুকে পড়েছে। এ সময়ে সাগরে হারিয়ে গেছে অন্তত ৪৪৩ জন।

>

তিউনিসিয়ায় নৌকাডুবিতে নিখোঁজ ৩৯ বাংলাদেশির নাম–পরিচয় পাওয়া গেছে 
মানব পাচারে যুক্ত নোয়াখালী ও শরীয়তপুরের চক্র শনাক্ত 
নোয়াখালীর তিন ভাইয়ের সঙ্গে একটি শক্তিশালী চক্র রয়েছে লিবিয়া আর তুরস্কে

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ দপ্তরের (ইউনিডক) ২০১৮ সালের মানব পাচারবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৫ শতাংশ নাগরিককে পাওয়া গেছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে মানব পাচারের শিকার হওয়া এসব লোক মূলত ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিক। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার লোকজন বিশ্বের ৪০টি দেশে মানব পাচারের শিকার হয়।

মানব পাচারকারীদের খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিদেশগামী বাংলাদেশিরা বলছেন, মূলত উন্নত জীবনের আশায় এসব ঝুঁকিপূর্ণ পথে তাঁরা দেশের বাইরে পা রাখেন। তবে সরকারের তথ্য অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে হয়েছে ২১ শতাংশ। মোট দেশজ উৎপাদন গত চার বছরে অব্যাহতভাবে ৭ থেকে বেড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সময় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ ডলার হয়েছে। তবে এ সময়ে বেকারত্বের হার কমবেশি একই রকম থেকে গেছে। পছন্দমতো কাজ পাচ্ছেন না অন্তত ৬৬ লাখ নারী-পুরুষ।

দেশের উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির এমন আবহে বাংলাদেশি নাগরিকদের মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ার কারণ জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মরিয়া হয়ে যাঁরা বিদেশ যাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। তাঁদের অনেকেই হয়তো স্কুল কিংবা কলেজের পাট চুকিয়েছেন। অর্থনীতি এখন কোন ধরনের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে? অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি হয়তো চায়ের দোকানে কিংবা অ্যাপভিত্তিক পরিবহন যাত্রীসেবায় লোকজনের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে। কিন্তু বিদেশগামী তরুণেরা আসলে কী ধরনের কাজ চান, সেটা আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে। তাঁরা নিজেদের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ চান। মর্যাদাসম্পন্ন কাজ চান। আমরা কি সেটা দিতে পারছি? তাই ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার দিয়ে এটা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন