default-image

মা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন দুদিনের জন্য। সেই দুদিন আর শেষ হয় না। দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মায়ের দেখা পাচ্ছে না দুই শিশু মেনশন চাকমা ও উচ্ছ্বাস চাকমা। এখন মায়ের অপেক্ষায় দিন কাটে তাদের। এই দুই শিশুর মা বাঘাইছড়ির ব্যাটলিং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফুলকুমারী চাকমা।

গত ১৮ মার্চ সাজেকে উপজেলা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে আহতের একজন তিনি। সাজেকর দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের বটতলা এলাকায় সংঘটিত ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ছয়জন। পরে গুরুতর আহত ১৮ জনের মধ্যে মারা যান আরও দুজন।
আহত অন্যরা চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও ফুলকুমারী চাকমা এখনো হাসপাতালে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের শয্যায়। তিনি সাজেক ইউনিয়নের মাচালং মিলনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ফুলকুমারী চাকমার স্বামী হেমন্ত চাকমা বলেন, প্রায় দুই মাস ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ৬ মে ঢাকার সাভারের সিআরপিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানে তাঁকে (স্ত্রী) ফিজিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী কোমরের সামান্য উপরে মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হন। অস্ত্রোপচার সফল হলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে অবস্থার অবনতি ঘটে। ইতিমধ্যে কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে গেছে। যন্ত্রণায় দিন-রাত শুধু কান্নাকাটি করেন। উন্নত চিকিৎসা না হলে তিনি সুস্থ হবেন না বলে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছেন।

ফুলকুমারী চাকমার বাড়ি বাঘাইছড়ি উপজেলা খেদারমারা ইউনিয়নের ঢেবাছড়ি গ্রামে। ঘটনার পর তাঁর দুই ছেলে মেনশন ও উচ্ছ্বাসকে কাকী রুপালী চাকমা দেখাশোনা করছেন। কিন্তু মা না থাকায় বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা ও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। দুই ভাইয়ের পড়াশোনায় মন বসে না। বিদ্যালয়ে ঠিকমতো যাচ্ছে না তারা। মেনশন উলুছড়ি মৌজা উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ও উচ্ছ্বাস চাকমা উলুছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে।

গত সোমবার ঢেবাছড়ি গ্রামে গেলে দুই ভাইকে ঘরেই পাওয়া যায়। বিষণ্ন দুই ভাইয়ের মুখ ভার। মেনশন ও উচ্ছাস বলে, মা না থাকায় লেখাপড়া করতে মন বসে না। শুধু মার কথা মনে পরে।

মেনশন ও উচ্ছ্বাসের কাকী মা রুপালী চাকমা বলেন, ‘দুই ভাইয়ের অসহায় অবস্থা দেখে আমার সংসার ফেলে তাদের দেখাশোনা করছি। তাদের মায়ের অসুস্থতার কারণে বাবাকেও সেখানে থাকতে হয়। শুধু দুই ভাই বাড়িতে থাকছে। তারা দুজনই ক্লাসে প্রথম। কিন্তু এখন লেখাপড়ায় ব্যাঘাত হচ্ছে।’

>বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী সহিংসতা
গত ১৮ মার্চ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন আটজন
আহতদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে শিক্ষিকা ফুলকুমারী চাকমা

বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি বিবর্শী চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক সমিতি আহত ফুলকুমারী চাকমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবি করে আসছে। কিন্তু এখনো কেউ সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার অভাবে পঙ্গু হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। তাঁর উন্নত চিকিৎসার দাবিতে বাঘাইছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলায় মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা সাভারের সিআরপি চিকিৎসক মো. জাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, ফুলকুমারী চাকমা নামে গুলিতে আহত একজন রোগী ভর্তি আছেন। তাঁকে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে গেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার পর গুরুতর আহত ১৮ জনকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সামরিক হাসপাতালে নেওয়ার পথে আবু তৈয়ব নামে একজন পোলিং কর্মকর্তা মারা যান। পরদিন ১৯ মার্চ আহত ছয়জনকে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর গত ৮ এপ্রিল রাতে নিরু বিকাশ চাকমা (৫২) নামে আরেকজনের মৃত্যু হয়। তিনি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কংলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রে পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বাড়ি উপজেলা বাঘাইছড়ি গ্রামে। গত ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সেদিনের ঘটনায় আহত সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু ফুলকুমারী চাকমা এখনো ফিরতে পারেননি।

ঘটনার পরপর প্রশাসনের গঠন করা তদন্ত কমিটি ঘটনার জন্য নির্বাচন বর্জন করা পাহাড়ি একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলকে দায়ী করে।

বাঘাইছড়ি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয়ের ৪০-৫০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। এ পর্যন্ত নয়জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার এখনো তদন্ত চলছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0