default-image

সাত বছর আগে (২০১৪) রাজধানীর মুগদা এলাকার বাসিন্দা জাহেরুন নেসা মারা যান। রেখে যান দুই ছেলে, এক মেয়ে। তাঁর মৃত্যুর ছয় বছরের মাথায় ঢাকার মতিঝিলের সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে নিজেকে জাহেরুন নেসা দাবি করে নামজারির মামলা করেন আরেক নারী। দাবি, করেন তিনি জাহেরুন নেসা। খবর পেয়ে আসল জাহেরুন নেসার একজন উত্তরাধিকারী সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে আসেন। জমা দেন আসল জাহেরুন নেসার মৃত্যুর সনদপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র। তখন ভূমি কর্মকর্তা জাহেরুন নেসাকে তলব করেন। দেখতে চান তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র। একপর্যায়ে নকল জাহেরুন নেসা ভূমি কর্মকর্তার কাছে স্বীকার করেন, লোভে পড়ে তিনি এ কাজ করেছিলেন।

ভূমি কর্মকর্তার নির্দেশে ওয়ারী থানা-পুলিশ সম্প্রতি নকল জাহেরুন নেসাসহ ওই জালিয়াত চক্রের তিন সদস্যকে আটক করে। পরে আসল জাহেরুন নেসার নাতি আবদুল মালেক বাদী হয়ে নকল জাহেরুন নেসাসহ তিনজনের নামে মামলা করেন। এখন পর্যন্ত এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন জালিয়াত চক্রের পাঁচ সদস্য। এর মধ্যে একজন দলিল লেখকও আছেন।

ঢাকার মতিঝিল রাজস্ব সার্কেল বিভাগের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহনাজ হোসেন ফারিবা প্রথম আলোকে বলেন, মুগদার জাহেরুন নেসা মারা গেছেন ২০১৪ সালে। ছয় বছর পর জালিয়াত চক্রের সদস্যরা নকল জাহেরুন নেসাকে জীবিত সাজিয়ে জমি দখলের চেষ্টা করেছিলেন। দাবি করেছিলেন, নকল জাহেরুন নেসা নিঃসন্তান।

বিজ্ঞাপন

মামলার কাগজপত্র ও আসল জাহেরুন নেসার উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকৃত জাহেরুন নেসা মুগদা এলাকায় বসবাস করতেন। উত্তরাধিকার সূত্রে সবুজবাগের দক্ষিণগাঁও মৌজায় তিনি দশমিক ১৪৭২ একর সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা ওই সম্পদের মালিক হয়ে ভোগদখল করে আসছিলেন। তবে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা জাহেরুন নেসার ওই সম্পদ দখল নিতে জাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি করেন। বানান জাল দলিল। পরে জমির নামজারির জন্য গত বছরের ১৮ অক্টোবর মতিঝিলের রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে আবেদন করেন।

মামলার বিচার কার্যক্রমের নথিপত্রের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নকল জাহেরুন নেসা মোস্তফা কামাল নামের এক ব্যক্তিকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আম-মোক্তার) দেন। গত বছরের ২০ জানুয়ারি আসল জাহেরুন নেসার উত্তরাধিকারীরা হাজির হন। আদালতকে বলেন, জাহেরুন নেসা অনেক আগেই মারা গেছেন। যারা জাহেরুন নেসা বেঁচে আছেন বলে দাবি করেছেন, তাঁরা মিথ্যা কথা বলছেন। তখন আদালত নকল জাহেরুন নেসাকে হাজির করার জন্য সমন দেন। সমন পেয়ে ১৫ মার্চ নকল জাহেরুন নেসা হাজির হন।

default-image

কীভাবে নকল জাহেরুন নেসাকে শনাক্ত করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহনাজ হোসেন ফারিবা প্রথম আলোকে বলেন, নকল জাহেরুন নেসা যেদিন হাজির হন, সেদিন তাঁর কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাহেরুন নেসা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে বলেছিলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে আবেদন করেছেন। তখন সেই আবেদনপত্র দেখাতে বলেন। তখন জাহেরুন নেসা তাঁর কাছে স্বীকার করেন, মোস্তফা কামালের ফাঁদে পড়ে তিনি এই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

নকল জাহেরুন নেসা ১৬ মার্চ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর স্বীকারোক্তির সূত্র ধরে জাল দলিল লেখক এম এ হাকিম মিয়া ও জালিয়াত চক্রের সদস্য সালাউদ্দিন হোসেনকে ১৮ মার্চ গ্রেপ্তার করে ওয়ারী থানা-পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কমল বড়াল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জালিয়াত চক্রের অন্যতম হোতা মোস্তফা কামাল পেশাদার প্রতারক। তাঁর দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে। একটি চট্টগ্রামে, অন্যটি ঝালকাঠির। তিনি একেক সময় একেক পরিচয় দেন। কখনো সরকারি দলের নেতা, কখনো ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দেন।’

আদালতের অনুমতি নিয়ে মোস্তফা কামাল ও তাঁর সহযোগী অহিদুর রশীদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, মুগদার মারা যাওয়া জাহেরুন নেসার সম্পত্তি দখলে নেওয়ার জন্য মোস্তফা কামাল নকল জাহেরুন নেসাকে খুঁজে বের করেন। এখন পর্যন্ত যে তথ্য তাঁরা জানতে পেরেছেন, সে অনুযায়ী নকল জাহেরুন নেসার নামও জাহেরুন নেসা। তবে আসল জাহেরুন নেসার বাবার নামের সঙ্গে নকল জাহেরুন নেসার বাবার নামের মিল নেই।

default-image

ওয়ারী থানা-পুলিশ বলছে, নকল জাহেরুন নেসার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জের রামকৃষ্ণ কাঠি গ্রামে। তাঁর স্বামী আবদুর রশিদ অনেক আগে মারা গেছেন। তিনি বরিশালে বসবাস করতেন। তবে জালিয়াত চক্রের সদস্য মোস্তফা কামাল তাঁকে খুঁজে বের করে জমির জাল-কাগজপত্র তৈরি করেন। বিনিময়ে তাঁকে কিছু টাকা-পয়সা দেন জালিয়াত চক্রের সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন

ওয়ারী থানা-পুলিশ ঢাকার সিএমএম আদালতকে লিখিতভাবে জানায়, আসামি মোস্তফা কামাল সম্পর্কে জাহেরুন নেসার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হন। অর্থের লোভে পড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন জাহেরুন নেসা।

অবশ্য জাহেরুন নেসা, মোস্তফা কামালসহ গ্রেপ্তার পাঁচ আসামি আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিতভাবে আদালতের কাছে দাবি করেন, তাঁরা নির্দোষ। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁরা জড়িত নন।

তবে আসল জাহেরুন নেসার নাতি ও মামলার বাদী আবদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার দাদি জাহেরুন নেসা মারা গেছেন সাত বছর আগে। তারপরও মোস্তফা কামাল গংরা জাহেরুন নেসাকে জীবিত দাবি করে জমি দখলের পাঁয়তারা করেছিলেন।’

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন