বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরেকটি ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের ফলে ১১ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মামলার তদারককারী পরিবারের সদস্যটি ১২ বছর পর একইভাবে নিহত হয়েছেন।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনকালে অপরাধের অভিযোগ উঠলে সে মামলা আমলে নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে। একটি ঘটনায় সেই অনুমতি চেয়ে আদালত ৯ বছরেও উত্তর পাননি।

পরিবারগুলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে। বিচারের নাগাল পায়নি। কমিশনের সুপারিশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধা আক্কাসের ছেলের মৃত্যুসহ দুটি ঘটনার তদন্ত করেছিল। তদন্তে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।

অন্যদিকে সাত ঘটনার কোনোটিকে বন্দুকযুদ্ধ, কোনোটিকে দুই সন্ত্রাসী দলের মধ্যকার গোলাগুলি দাবি করে এক বা একাধিক মামলা করেছে র্যাব বা পুলিশ। কিন্তু তদন্তে কোনো সন্ত্রাসী দল শনাক্ত হয়নি। মামলা শেষ হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। পুলিশ প্রবিধান বলছে, যেকোনো বন্দুকযুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার যুক্তিযুক্ত ও বিধিসম্মত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী তদন্ত করতে হবে। প্রতিটি ঘটনায় সেই তদন্ত হয়েছে। কিন্তু র্যাব বা পুলিশের ভাষ্য ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি।

অপরাধ দমনের নামে বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে মেনে নিয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, মাদক ব্যবসা ও ধর্ষণের মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের তুলে নিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যার অভিযোগ অনেক।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব আর স্বার্থেও বিনা বিচারে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে র্যাবের ১৭ জন সদস্যের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে ভাড়া খেটে অপহরণ করে সাত খুনের অভিযোগ হাইকোর্টে প্রমাণিত হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ১ হাজার ১৯৯টি বিচারবহির্ভূত হত্যার হিসাব দিচ্ছে।

২০০২-২০০৩ সালে টানা ৮৫ দিন যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ অভিযানে অন্তত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। ‘সন্ত্রাস নির্মূল’ করার যুক্তিতে আইন করে এসব কাজকে দায়মুক্তি দেয় তৎকালীন বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার।

অধিকারের হিসাবে, ২০০৭-২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিনা বিচারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মারা পড়েন ৩৩৩ জন। সংস্থাটি ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে ২ হাজার ৪৭০ জনকে হত্যার হিসাব দিচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে জুলাই পর্যন্ত সংখ্যাটি ২ হাজার ৫০৩।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দলটি ক্ষমতায় গেলে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে এমন হত্যার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্সের’ কথা বলে।

সে বছর জুনে আসকসহ তিনটি সংস্থা বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের দাবিতে হাইকোর্টে রিট করে। মামলাটি আজও ঝুলে আছে। ঝুলে আছে ২০০৬ সালে করা আরেকটি রিটের শুনানি। বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড কিন্তু চলছেই।

গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমি তো কোনো ক্রসফায়ার দেখি না। অ্যাটাক হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আত্মরক্ষার জন্য গুলি করে। সন্ত্রাসীরা সবাই অস্ত্রবাজ।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমি তো কোনো ক্রসফায়ার দেখি না। অ্যাটাক হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আত্মরক্ষার জন্য গুলি করে। সন্ত্রাসীরা সবাই অস্ত্রবাজ।’

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নীতি ঠিক করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাজনীতি। বিচারবহির্ভূত হত্যার পুরো বিষয়টিকে তাই এই আঙ্গিক থেকেই দেখতে হবে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা আমাদের সংস্কৃতির মধ্যেই চলে এসেছে। বেআইনি কিছুকে সরকার প্রশ্রয় দিতে পারে না। আইনশৃঙ্খলার সমস্যাগুলো আইনতই সমাধান করতে হবে। সময় লাগলেও এটাই সমাধান।’

গত ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ঘটনার পর অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরা সংবাদ সম্মেলন করে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের দাবি জানান। এরপর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বলছে, পুলিশ আশ্বস্ত করেছে এমন ঘটনা আর ঘটবে না। আর ৫ আগস্ট কক্সবাজারে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘ক্রসফায়ার শব্দের সঙ্গে আমরা একমত নই। এটি এনজিওরা বলেন।’

সিনহার মৃত্যুর পর ২৮ দিন পেরিয়েছে। এখন পর্যন্ত সারা দেশে কোনো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা খবরে আসেনি।

‘সাজানো নাটক’
মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস আলীর ছেলে নূর আলম ছিলেন চায়ের দোকানদার। ২০০৯ সালের ১৫ মে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় তাঁর গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। পাশে ছিল মিরপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ড প্রজন্ম লীগের সভাপতি সালাউদ্দিন সোহেলের লাশ।

র্যাব-৩ বলে, তাঁরা দুজন সন্ত্রসী। আগের রাতে বাহিনীর টহল দলের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তাঁরা মারা গেছেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কমিটি তদন্ত করে ২০১০ সালে প্রতিবেদনে লেখে, ঘটনাটি ছিল ‘সাজানো নাটক’। নিহত দুজন ‘সচ্চরিত্রের’ অধিকারী ছিলেন, সন্ত্রাসী কাজে জড়িত ছিলেন না। ঘটনার এক দিন আগে মিরপুর এলাকা থেকে তাঁদের ‘উঠিয়ে’ নেন র্যাবের সদস্যরা। ‘এনকাউন্টারে’ নয়, তাঁরা মারা গেছেন ‘সেম সাইড’ গুলিতে।

তদন্ত কমিটিতে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব কামরুন নাহার খানম, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (পিএএম) মো. সায়েদুর রহমান এবং মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস রিভিউ সোসাইটির অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মির্জা আশরাফুল ইসলাম। তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁরা আরও লেখেন, এই ‘অমানবিক ও নৃশংস’ ঘটনায় জড়িত প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার জন্য র্যাব-৩–এর দুই সদস্যকে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা প্রয়োজন। তাঁরা হচ্ছেন টহল দলটির নেতা ডিএডি মো. জাকির হোসেন এবং অভিযান পরিচালনা ও গুলি চালানোর আদেশ দানকারী কোম্পানি কমান্ডার মেজর মোস্তাফিজুর রহমান।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত র্যাবের আট সদস্য ও তাঁদের চার সহযোগীর বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ফৌজদারি মামলা করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে। মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরকে তা করতে বলে। গত সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস আলী প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলেই পুরো ঘটনা খোলাসা হয়ে যেত।

পুলিশ কেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়নি? ২৫ আগস্ট সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) সোহেল রানা এ প্রতিবেদককে বলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে জানতে চেয়েছেন। উত্তর এলেই জানাবেন।
default-image

তদন্তেই শেষ
২০০৯ সালের ৯ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে পূর্ব রামপুরা বাজার এলাকায় মডেল ও অভিনেতা কায়সার মাহমুদের লাশ পাওয়া যায়। র্যাব-১ রামপুরা থানায় মামলা করে।

মামলার এজাহারে আছে, ‘কায়সার মাহমুদ বাপ্পি’ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করার জন্য আট-দশজন সহযোগীর সঙ্গে শলাপরামর্শ করছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাবের সদস্যরা সেখানে যান। সন্ত্রাসীরা তাঁদের গুলি করে। আত্মরক্ষার্থে তাঁরাও গুলি করেন। গোলাগুলির পর কায়সার মাহমুদের লাশ দেখেন।

এজাহার অনুযায়ী, র্যাব-১-এর দলটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সহকারী পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক। তাঁর সঙ্গে আরও নয়জন ছিলেন। এজাহারে তাঁদের নাম রয়েছে। পরের বছর ঘটনাটির তদন্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি বলে, র্যাবের তথ্যদাতার ভুলের কারণে কায়সার মাহমুদকে ‘ক্রসফায়ার’ নামের হত্যার শিকার হতে হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা ছিল না। সন্ত্রাসের অভিযোগ ছিল কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি এবং কায়সার দুজনেরই ডাকনাম বাপ্পি। র্যাব-১ ‘ক্রসফায়ার’ করে ভুল লোককে মেরেছে।

তদন্ত কমিটিতে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব (আইন) স্মৃতি রাণী ঘরামী, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় এবং অধিকারের তৎকালীন সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান।

নিহত অভিনেতার বোনের স্বামী মো. মানজুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, বেঁচে থাকতে কায়সারের নামে কোনো মামলা ছিল না। মৃত্যুর পর রামপুরা থানায় ‘কায়সার মাহমুদ ওরফে কামরুজ্জামান ওরফে বাপ্পী ওরফে মিয়া ভাই’ নামে সন্ত্রাসের মামলা করা হয়। মানজুরুল আরও বলেন, পত্রিকায় তদন্ত প্রতিবেদনের খবর পড়ে তাঁরা মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, কমিশন মামলা করবে। কিন্তু করেনি।

মামলা কেন করা হয়নি, কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান তা মনে করতে পারলেন না। আর কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারহানা সাঈদ প্রথম আলোকে বললেন, সে সময়কার নথিপত্র সংরক্ষিত কম্পিউটারটি নষ্ট হয়ে গেছে।

আপস, ভাইও ‘ক্রসফায়ারে’
নাটোরের সিংড়ার কাকিয়ান জঙ্গলে সার ব্যবসায়ী আনছার আলীর (৩৫) লাশটা পাওয়া গিয়েছিল ২০০৮ সালের ২৬ জুলাই। পুলিশ বলে, তিনি ক্রসফায়ারে মারা গেছেন। আনছার আলীর বাবা রজব আলী বাদী হয়ে ১৪ পুলিশ সদস্যসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশি মামলা করেন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত বলে, কোনো ক্রসফায়ার হয়নি। আনছার আলীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে গল্প সাজানো হয়েছে।

তদন্তটি নাটোরের সিংড়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিকসহ ১২ পুলিশ সদস্য এবং তাঁদের ৭ সহযোগীকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে। পুলিশের ১১ জন ও বাকিরা আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

কিন্তু ঘটনাটি পরে নাটকীয় মোড় নেয়। বাবা রজব আলী প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার প্রভাবশালী লোকদের অনুরোধে তিনি আসামিদের সঙ্গে আপস করেন। আদালতে শুনানির সময় সাক্ষীরা সমঝোতা অনুযায়ী সাক্ষ্য দেন। ২০১৫ সালে আসামিরা খালাস পান।

২০১৯ সালের ৭ আগস্ট বগুড়ার শেরপুরের ভবানীপুর বাজারের পাশে আনছারের ভাই আফজাল হোসেনের (৪৫) গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। জেলা পুলিশ বলে, তিনি ছিলেন নিষিদ্ধঘোষিত পূর্ব বাংলা সর্বহারা দলের আঞ্চলিক নেতা। চরমপন্থী ডাকাত দলের বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন।

আফজালের ছেলে এনামুল হক সিংড়া আমলি আদালতে মামলা করেন। আরজিতে তিনি লেখেন, ঘটনার এক দিন আগে ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে কিছু লোক তাঁর বাবাকে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের বন্দর নামের জায়গা থেকে কালো মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাবা রজব আলী প্রথম আলোকে বলেন, ভাইয়ের হত্যার মামলাটি দেখভাল করতেন আফজাল। আফজালের মৃত্যুর ঘটনায় আবার মামলা করায় তাঁদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ভয়ে তাঁরা এখন বাড়িতেই থাকেন না। আদালতের নির্দেশে আফজাল হত্যার মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নাটোর সিআইডির পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে।

মন্ত্রণালয় নিশ্চুপ
২০১০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগে আজাদ হোসেন ওরফে পাপ্পু (২২) ও আবদুস সাত্তারের (২৫) গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। দুজনই ওই এলাকায় ভাঙারির ব্যবসা করতেন।

এ ঘটনায় থানায় মামলা করেন র্যাব-১০-এর তৎকালীন ডিএডি কামরুল হাসান। এজাহারে তিনি লেখেন, দুই সন্ত্রাসী দলের মারামারির খবর পেয়ে তাঁরা সেখানে গিয়ে গুলির মুখে পড়েন। তাঁরা জীবন ও সরকারি মালামাল রক্ষার্থে পাল্টা গুলি করেন। সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেলে গুলিবিদ্ধ লাশ দুটি পান।

নিহত দুজনের পরিবার র্যাব-১০-এ তখন কর্মরত ১৯ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার আবেদন করে। পরিবার অভিযোগ করে, ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে দুজনকে তুলে নিয়ে গুলি করে মারা হয়েছে। মামলার আইনজীবী মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সুরতহাল প্রতিবেদনে আজাদ হোসেন ও আবদুস সাত্তারের শরীরে আঘাতের চিহ্নের কথা লেখা ছিল। সেটি দেখে আদালত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অভিযোগ আমলে নেওয়ার অনুমতি চান।
আদালতের নথি বলছে, আদালত অনুমতির আবেদন পাঠিয়েছিলেন ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল। কিন্তু আজও মন্ত্রণালয় উত্তর দেয়নি।

আজাদ হোসেনের মা শাহীনা বেগম ১৯ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার কিছু লোকের রোষানলে পড়েছিল ছেলে। ভয়ে তাকে নিয়ে মিরপুরে ভাইয়ের বাসায় এসেছিলেন। ঘটনার আগের দিন সে বাসার সামনে কালো কাচের জানালা তোলা একটি হাইয়েস গাড়ি আসে। আশপাশের লোকদের বন্দুক দেখিয়ে আজাদকে উঠিয়ে নিয়ে যান র্যাবের সদস্যরা। দু-এক ঘণ্টা পর আজাদ মুঠোফোনে মাকে বলেন, র্যাব-১০–এর একজন ‘আঙ্কেল’ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গিয়েছেন। পরদিন সকালে কেরানীগঞ্জের লোকজন ফোন করে তাঁর লাশ পড়ে থাকার খবর দেন।

মামলা করার পর এলাকায় নানা হুমকি পেয়ে আজাদের মা এখন মিরপুরেই থাকছেন। সাত্তারের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

অরণ্যে রোদন
২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর বালুরমাঠ এলাকায় পানি ব্যবসায়ী জুয়েলের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। তাঁর স্ত্রী শিরিন আক্তারের অভিযোগ, থানার পুলিশ সদস্যরা জুয়েলকে ধাওয়া করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর বন্দুকযুদ্ধের নামে তাঁকে হত্যা করেছেন।

শিরিন এ কথা লিখেছেন মানবাধিকার কমিশনের কাছে। কমিশন চিঠি দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলে। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। মন্ত্রণালয় জবাব দেয়নি। শিরিন প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর যাত্রাবাড়ী থানা মামলা নেয়নি। পুলিশ তাঁর শাশুড়িকে বলেছে, মামলা করতে গেলে জুয়েলের ছেলের প্রাণ যাবে।

সাতক্ষীরার তালা থানার একটি কলেজের শিক্ষক এস এম বিপ্লব কবীর ছিলেন জালালপুর ইউনিয়নের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ২০১৪ সালের ১৮ জুলাই সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর ডান ঊরু গুলিবিদ্ধ ছিল। পুলিশ তালা থানায় করা মামলার এজাহারে বলেছিল, বিপ্লব চরমপন্থী দল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য। তিনি একদল সন্ত্রাসীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

বিপ্লবের মা হালিমা বেগম মানবাধিকার কমিশনে দেওয়া অভিযোগে লিখেছেন, ১৭ জুলাই রাতে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা বিপ্লবকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যান। তাঁরাই তাঁর ঊরুতে গুলি করেছিলেন। কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল। মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেয়নি।

কমিশনের পদস্থ একটি সূত্র বলছে, সংস্থাটির নির্দেশে মন্ত্রণালয় মাত্র দুটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। ২০১৩ সাল থেকে অন্তত ১৪টি ঘটনায় কমিশন ব্যবস্থা নিতে বলেছিল। মন্ত্রণালয় আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম অবশ্য প্রথম আলোকে বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভালো সাড়া পাচ্ছেন। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিটি ঘটনার পরই ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করেন। প্রয়োজন মনে হলে বিচারের আওতায় আনেন। প্রথম আলোর দেখা সাতটি ঘটনার মাত্র একটিতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের পর মামলা হয়েছে।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ইতি
আনছার আলীর ভাই আফজালের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় শেরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আতিকুর রহমান বাদী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও হত্যা মামলা করেন। ওসি মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত প্রায় শেষ। চূড়ান্ত প্রতিবেদন গোছানো হচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধা আক্কাসের ছেলে নূর আলম আর প্রজন্ম লীগের নেতা সালাউদ্দিন সোহেল বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন বলে ঢাকার সবুজবাগ থানায় মামলা করেছিল র্যাব। এই মামলাটিতেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় থানা-পুলিশ। অন্যদিকে ভুক্তভোগী পক্ষের মামলাতেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন হওয়ার নজির কম নেই। ২০০৯ সালের ২৭ মে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে র্যাবের গুলিতে নিহত হন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মহসিন শেখ। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে র্যাব–২ বলে, ছিনতাই প্রতিরোধে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছিল। ওই দুজনকে তল্লাশি করতে গেল তাঁরা গুলি ছোড়েন। র্যাবের সদস্যরা পাল্টা গুলি ছুড়লে দুজন মারা যান।

নিহত জিন্নাহর ভগ্নিপতি মো. জসিম উদ্দিন ইনস্টিটিউটের একজন ছাত্রকে বাদী করে আদালতে নালিশি মামলা করেন। মামলায় র্যাব–২-এর তৎকালীন ডিএডি মো. ফুরজাল হোসেনসহ ১১ জন সদস্যকে বিবাদী তথা আসামি করা হয়।

জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, একে একে থানা–পুলিশ, ডিবি, সিআইডি এবং পিবিআই ঘটনাটি তদন্ত করে। কিন্তু সব কটিই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। নির্বাহী তদন্ত হয়েছে। সেটাও র্যাবের পক্ষে গেছে। অথচ জিন্নাহ বেঁচে থাকতে তাঁর সম্পর্কে কারও অভিযোগ ছিল না।

এই মামলার আইনজীবী কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নিজেদের করা মামলার এজাহারে র্যাব লিখেছিল, নিহত দুজন পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। অথচ প্রতিটি গুলিই লেগেছিল শরীরের সামনের দিকে। সাতটি গুলি ছোড়া হয়েছিল। প্রতিটিই শরীরে লেগেছিল।

এই প্রতিবেদক ভুক্তভোগী সাতটি পরিবারের স্বজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই সিনহা হত্যার পর রাষ্ট্রের তৎপরতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের ধারণা, সিনহা সাবেক সেনা কর্মকর্তা হওয়াতেই এটা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের স্বজনদের হত্যার তদন্ত হলে তাঁরাও সুবিচার পাবেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিকের মতে, রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অনুমোদনে বছরের পর বছর ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে। তবে সব দেশেই একসময় এমন ঘটনার সত্য প্রকাশ পায়, আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, টেকনাফে পুলিশের গুলিতে সিনহা নিহত হওয়ার পর সেই প্রক্রিয়াই শুরু হয়েছে। ক্রমে আরও ঘটনা আলোতে আসবে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মুক্তার হোসেন, নাটোর)

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন