রাজশাহীতে এবার এসএসসি পরীক্ষায় কেন্দ্রগুলোতে বিকল্প পদ্ধতিতে নকল করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এ পদ্ধতিতে মূল ভূমিকা রাখছেন কক্ষগুলোতে পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্বে থাকা কতিপয় শিক্ষক। এতে পরীক্ষার্থীরা এখন সরাসরি নকল নিয়ে কেন্দ্রে না ঢুকেও অনায়াসে অন্তত ৪০ নম্বর পাওয়া নিশ্চিত করে ফেলছে।
অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে ও বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে জানা যায়, পরীক্ষায় বিষয়ভেদে ৩৫ থেকে ৪০ নম্বরের ‘বহুনির্বাচনী অভীক্ষা’ বা অবজেকটিভ প্রশ্ন রয়েছে। পরিক্ষার্থীরা এই নম্বর নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠছে। গতকাল শুক্রবার ছিল পদার্থবিজ্ঞান, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং ও ইতিহাসের পরীক্ষা। পরীক্ষা চলাকালে রাজশাহী নগরের তিনটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, এই পদ্ধতিতে নকলের সময় বাইরের কোনো পরিদর্শক কক্ষের কাছে এলেই পরীক্ষার্থীদের ধমক দিয়ে থামানোর চেষ্টা করছেন শিক্ষকেরা। বিকল্প এ পদ্ধতির একটি পন্থা হলো, পরীক্ষককে কোনো পরোয়া না করে পারস্পরিক কথাবার্তার মধ্য দিয়ে স্বল্পতম সময়ে পরীক্ষার্থীদের উত্তর আদান-প্রদান করা। দ্বিতীয় পন্থা হলো, শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রশ্নোত্তরের ফটোকপি সংগ্রহ করে তা দেখে উত্তর দেওয়া।
একটি কেন্দ্র গিয়ে দেখা যায়, দুই ঘণ্টা ১০ মিনিটের সৃজনশীল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ‘বহুনির্বাচনী অভীক্ষা’র অংশ শুরু হলে পরীক্ষার্থীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। কেউ কেউ আঙুল তুলে দেখাচ্ছে কোন প্রশ্নের কোন উত্তরটি সঠিক। যেমন—একটা প্রশ্নের ‘ক’ উত্তর সঠিক হলে সেখানে এক আঙুল, ‘খ’ সঠিক হলে দুই আঙুল তুলে তা নির্দেশ করা। এ সময় কক্ষে এক পরীক্ষককে খাতায় সই করার কাজে ব্যস্ত ও আরেকজনকে শুধু ধমক দিয়ে উত্তর বলাবলি থামানোর চেষ্টা করতে দেখা গেল। এতে এক মুহূর্তের জন্য কখনো তারা থামছে, আবার আগের মতো শুরু করছে।
এ অবস্থায় একজন শিক্ষক দুঃখ করে বললেন, ‘এরা জ্বালিয়ে মারছে। এর আগের পরীক্ষায় একজন শিক্ষক দেখাদেখি করার অপরাধে এক শিক্ষার্থীর খাতা কেড়ে নিয়েছিলেন। পরে ওই শিক্ষার্থীর অভিভাবক তাঁকে ফোন করে বলেন, ‘আপনি কি মানসিকভাবে অসুস্থ?’
চারঘাট উপজেলার একজন পরীক্ষার্থীর অভিভাবক অভিযোগ করেন, ‘শিক্ষকেরা নিজেরাই বহুনির্বাচনী অভীক্ষার ৪০ নম্বর কক্ষের মধ্যে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে সব শিক্ষার্থীকে বলে দিচ্ছেন।’ বাঘা উপজেলার একটি কেন্দ্রের দুই শিক্ষার্থী জানায়, প্রশ্নপত্র বিলির কিছুক্ষণ পর শিক্ষকেরাই উত্তরপত্র তৈরি করে ফটোকপি করে কক্ষে প্রতি দুজন শিক্ষার্থীকে একটি করে কপি সরবরাহ করছেন। সে অনুযায়ী উত্তরপত্র ভরাট করা শেষে তা ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে ৪০টা বৃত্ত ভরাটে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগছে। এই স্বল্প সময়ের কারণে বাইরে থেকে কেউ এসে নকলের বিষয়টি আর ধরতে পারছেন না।
শহরের কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষকেরা এ পদ্ধতিতে নকলে সহযোগিতা তেমন না করলেও পরীক্ষার্থীদের পারস্পরিক কথাবার্তার মাধ্যমে উত্তর বিনিময় করার বিষয়টি ঠেকাচ্ছেন না তাঁরা। গ্রামের কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষকদের নতুন পদ্ধতিতে নকলে সহযোগিতা করার অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। পরীক্ষা চলাকালে বাইরে থেকে কেউ পরিদর্শনে গেলে পরীক্ষার্থীদের ধমক দিয়ে তাঁরা সাবধান করে দিচ্ছেন।
কর্তব্যরত কয়েকজন পরিদর্শক অভিযোগ করেন, নগরের সরকারি বিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষার্থীদের বেসরকারি বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এখানে বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা দায়িত্বে থাকেন। পরীক্ষার্থীরা তাঁদের পরোয়া করতে চায় না।
মেধাবী একজন শিক্ষার্থী দুঃখ করে বলে, ‘অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ভালো পড়াশোনা করে কোনো লাভ হলো না।’
বাঘার আড়ানী পরীক্ষাকেন্দ্রে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক অভিযোগ পেয়ে ভেতরে যেতে চাইলে কেন্দ্রসচিবের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকটি কক্ষ ঘুরে দেখানো হয়। তখন ভেতরে একেবারে স্বাভাবিক পরিবেশ দেখতে পান তাঁরা।
নতুন পদ্ধতিতে এই নকল করার ব্যাপারে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষানিয়ন্ত্রক শামসুল কালাম আজাদের কাছে জানতে চাইলে বলেন, তিনি একটি দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় রয়েছেন। এ জন্য (শুক্রবার) কোনো কেন্দ্রে যেতে পারেননি। তবে কেন্দ্রসচিবদের নিয়ে বৈঠক করবেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন