জমির প্রকৃত মৌজা রেট নির্ধারণ করতে না পারায় প্রতিবছর বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। আর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বলছে, এমন মৌজা রেট দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে ও অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ বাড়ায়।

সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি। এ জন্য এলাকাভেদে জমি বা ফ্ল্যাটের সর্বনিম্ন বাজারদর (মৌজা রেট) নির্ধারণ করে দেয় সরকার। কিন্তু এ মৌজা রেটের সঙ্গে সত্যিকারের বাজারদরের ফারাক অনেক। কোথাও প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে মৌজা রেট কয়েক গুণ কম, আবার কিছু ক্ষেত্রে বেশি।

বর্তমান মৌজা রেট অনুযায়ী, ধানমন্ডি এলাকার ১ শতাংশ জমির সর্বনিম্ন দাম ৪৩ লাখ ৯৩ হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ধানমন্ডির কোথাও এ দামে জমি বেচাকেনা হয় না। আবাসন ব্যবসায়ীরাও বলছেন, ধানমন্ডিতে জমি কিনতে গেলে মৌজা রেটের অন্তত তিন গুণ টাকা গুনতে হয়। ফ্ল্যাট প্রকল্প করতে কাঠাপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা সাইনিং মানি দিতে হয়। মৌজা রেটে ফ্ল্যাটের সর্বনিম্ন বাজারদরও উল্লেখ থাকে। এর সঙ্গেও বাস্তবের কোনো মিল নেই। একই অবস্থা ঢাকার গুলশান, বনানীসহ সারা দেশে।

সারা দেশে জমি ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিল নিবন্ধন করতে হয় সরকারের নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীন সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে। এ নিবন্ধন অধিদপ্তরের মাধ্যমেই মৌজা রেট নির্ধারণ করা হয়।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুটের সর্বনিম্ন মূল্য ১ হাজার ৫০০ টাকা, অন্যান্য শহরে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং মফস্বল এলাকায় ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের কোথাও এ দামে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ নেই।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের বিভিন্ন এলাকার মৌজা রেট ২০১৬ সালে শেষবারের মতো নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মৌজা রেট কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে প্রস্তাবিত একটি মৌজা রেটও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি কার্যকর হয়নি। আগের মৌজা রেটই ২০২২ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।

প্রচলিত মৌজা রেট ধরে গত ১২ অর্থবছরে প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ দলিল হয়েছে। এসব দলিল থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬৫১ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে নিবন্ধন অধিদপ্তর। বাস্তবসম্মত মৌজা রেট হলে এ আয়ের পরিমাণ অন্তত তিন গুণ হতো বলে একাধিক সাবরেজিস্ট্রার জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে মৌজা রেটে ‘কিছু সমস্যা’ আছে বলে স্বীকার করেছেন নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শহীদুল আলম। তিনি বলেন, বাস্তবের সঙ্গে মিল রেখে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৌজা রেট পুনর্নির্ধারণের জন্য অধিদপ্তর কাজ করছে।

চলমান মৌজা রেট ব্যবস্থায় দুর্নীতির সুযোগ আছে। এটা জেনেবুঝেই ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি
বিজ্ঞাপন

যেভাবে মৌজা রেট নির্ধারিত হয়

মৌজা রেট নির্ধারণের কাজটি হয় ‘সর্বনিম্ন বাজারমূল্য বিধিমালা’ অনুসরণ করে। এ বিধিমালা অনুযায়ী, বাজারমূল্য নির্ধারণ করে একটি কমিটি। কমিটির মাধ্যমে প্রতি দুই বছর অন্তর বাজারমূল্য হালনাগাদ করা হয়। এ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ে (২২ মাস) দলিলে উল্লেখ করা দামের (হস্তান্তর মূল্য) গড় করে নতুন বাজারদর নির্ধারণসংক্রান্ত প্রস্তাব তৈরি করা হয়। পরে মৌজা রেট চূড়ান্ত করেন নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক।

গুলশান সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অধীনে মৌজা আছে ১৪টি। এ ১৪ মৌজায় ৮ ধরনের জমি আছে। মৌজা রেট অনুযায়ী, ধরনভেদে এ এলাকার ১ শতাংশ জমির দাম ১ লাখ থেকে ৫৮ লাখ টাকা। কিন্তু গুলশানের কোথাও কোটি টাকা শতাংশের নিচে জমি পাওয়া যায় না। বাণিজ্যিক জমির দাম শতাংশপ্রতি ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকাও পড়ে। সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মৌজা রেট ধরেই বেশির ভাগ দলিল হয়।

রাজস্ব ফাঁকি

একাধিক দলিললেখক মনে করেন, দলিলে জমি, প্লট বা ফ্ল্যাট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাম কম দেখানোর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে মূল কারণ নিবন্ধন ফি ফাঁকি দেওয়া।

দলিলে উল্লেখ করা দামের একটি অংশ ফি হিসেবে সরকারকে দিতে হয়। এর মধ্যে স্ট্যাম্প ডিউটি দেড় শতাংশ, নিবন্ধন ফি ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার কর ৩ শতাংশ এবং এলাকাভেদে ১ থেকে ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর দিতে হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের জমি-ফ্ল্যাট কেনাবেচা হলে আরও ৫ শতাংশ উৎসে কর যোগ হয়। সব মিলিয়ে মোট দামের সাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফি দিতে হয় সরকারকে। জমির দাম যত বেশি দেখানো হবে, ফি তত বাড়বে।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং সোসাইটি অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের কোনো দেশে বাংলাদেশের মতো এত নিবন্ধন ফি দিতে হয় না। নিবন্ধন ফি বেশি হওয়ার কারণেই মানুষ দলিলে দাম কম দেখান।

আবার কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধার জন্য দলিলের দাম বেশি দেখানোর ঘটনাও আছে বলে জানিয়েছেন নিবন্ধন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা। নাম না প্রকাশের শর্তে তিনি বলেন, বেশি ব্যাংকঋণ নিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইচ্ছা করে দলিলে দাম বেশি লেখেন।

কিছু ক্ষেত্রে মৌজা রেট জমির প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে বেশি বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে বাধ্য না হলে মানুষ দলিল করতে আগ্রহী হন না।

গত ৩ ডিসেম্বর এমন ঘটনার শিকার হন মো. মামুন (ক্রেতা) ও আবদুর রহিম (বিক্রেতা)। তাঁদের জমি কেনাবেচা হয় প্রায় ৫ লাখ টাকায়, তবে মৌজা রেটের কারণে দাম দেখাতে হয় ২১ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন

দুদক যা বলে

প্রকৃত বাজারদর ও মৌজা রেটের তারতম্য দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে উল্লেখ করে গত ২৩ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে দুদক। চিঠিতে বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে বাজারমূল্য নির্ধারণ বিধিমালা সংশোধনের অনুরোধ করা হয়েছে। এর আগে একই বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত চারটি সভা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত একটি সভায় সমস্যা সমাধানে ছয়টি সুপারিশ করা হয়েছিল। সুপারিশগুলো চিঠি দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানিয়েছে দুদক।

সুপারিশের মধ্যে রয়েছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে জমির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের জন্য কমিটি গঠন। কমিটি প্রকৃত বাজারমূল্য যাচাই করে প্রতিবেদন দেবে, সেই আলোকে সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হবে।

সুপারিশে ফ্ল্যাট বা জমি কেনার ক্ষেত্রে বারবার অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ বন্ধ করে শুধু একবার এ সুযোগ রাখার জন্য বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, চলমান মৌজা রেট ব্যবস্থায় দুর্নীতির সুযোগ আছে, এটা জেনেবুঝেই ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন