সাজা বেড়েছে, ধর্ষণ কমেনি

সাজা কঠোর করা হলেও দেশে ধর্ষণ কমেনি। আইন সংশোধনের পর অন্তত এক মাসের হিসাব বলছে, আগের মাসের তুলনায় ধর্ষণ বেড়েছে।

দেশজুড়ে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভের পর সরকার গত মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করা হয় ১৩ অক্টোবর, অর্থাৎ ওই দিন থেকে নতুন সাজা কার্যকর হয়। আইন কঠোর করার ক্ষেত্রে সরকারের আশা ছিল, ধর্ষণের ঘটনা কমবে।

নতুন সাজা কার্যকর হওয়ার পর গত ১৪ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত ধর্ষণের সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, এ সময়ে ১৭১টি ঘটনায় ১৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন, যা আগের এক মাসের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেশি। আইন সংশোধনের আগের এক মাসে প্রতিদিন গড়ে চারজনের কম ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। পরের এক মাসে দিনে গড়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ছয়জনের বেশি। এখানে মনে রাখা দরকার, কয়েকটি ঘটনা আগে ঘটলেও আইন সংশোধনের পরের এক মাসে প্রকাশিত হয়।

বিজ্ঞাপন
আমি মনে করি না যে ধর্ষণ কমছে না। প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেছি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোকে তিনি যেন মামলা দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেন। কিছুদিনের মধ্যেই ফল পাওয়া যাবে
আনিসুল হক, আইনমন্ত্রী

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যও বলছে, ধর্ষণ বেড়েছে। যদিও ডিএমপি শুধু ঢাকায় ধর্ষণের ঘটনার হিসাব রাখে। তাদের হিসাব মাসভিত্তিক। ডিএমপির হিসাব বলছে, অক্টোবরে ঢাকায় ৮৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যা আগের মাসে ছিল ৬০টি। জুন, জুলাই ও আগস্টেও সংখ্যাটি কম ছিল।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আমি মনে করি না যে ধর্ষণ কমছে না। প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেছি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোকে তিনি যেন মামলা দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেন। কিছুদিনের মধ্যেই ফল পাওয়া যাবে।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘একেবারে ছোট শিশুকে ধর্ষণের যেসব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসছে, তাতে আমার খটকা লাগে। বলছি না, সেসব মিথ্যা। অনেক সময় জমিজমার বিরোধেও ধর্ষণের মামলা দেওয়া হয়। সেসব খতিয়ে দেখা দরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও ধর্ষণের ঘটনাগুলো নিবিড়ভাবে তদন্তের অনুরোধ করেছি।’

৬৪ শতাংশ শিশু-কিশোরী

সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে ২৫ সেপ্টেম্বর এক তরুণী ছাত্রলীগ কর্মীদের দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। এরপর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ দুটি ঘটনায় সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর দুই সপ্তাহের বিক্ষোভের মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে সরকার।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইন সংশোধনের পর এক মাসে যেসব ধর্ষণের ঘটনা প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে, তার বেশির ভাগ শিশু ও কিশোরী। এ সময় ভুক্তভোগী ১৮৩ জনের মধ্যে ১১৮টিই শিশু। শতকরা হিসাবে যা ৬৪ শতাংশ। উল্লেখ্য, এর মধ্যে ৮টি ছেলে শিশু। আলোচ্য এক মাসে ধর্ষণের শিকার হওয়া ৪৯ জনের বয়স ১৯ থেকে ৩০ বছর। বাকি ১৬ জনের বয়স এর চেয়ে বেশি। এ সময় সর্বোচ্চ ৫০ বছর বয়সী একজন ধর্ষণের শিকার হন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, শিশু অথবা কিশোর-কিশোরীদের প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার ক্ষমতা কম থাকে বলে তারা বেশি ধর্ষণের শিকার হয়।

ধর্ষণের শিকার হওয়া শিশু-কিশোরীদের এক-তৃতীয়াংশের মতো স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। অন্য ভুক্তভোগীর মধ্যে ২৪ জন গৃহবধূ, ৫ জন প্রবাসীর স্ত্রী, ৫ জন কলেজছাত্রী, ৫ জন পোশাককর্মী ও ২ জন বিধবা নারী রয়েছেন। ধর্ষণের শিকার মোট ভুক্তভোগীর ৪৩ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর ১১টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।

বিজ্ঞাপন
শাস্তির কঠোরতার সঙ্গে অপরাধ কমার সম্পর্ক নেই। শাস্তি যত কঠোর হয়, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার তত কমে।
শাহদীন মালিক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

শ্রমঘন এলাকায় বেশি

আইন সংশোধনের পর এক মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেশি বরিশালে। সেখানে মোট ভুক্তভোগী ১৮ জন। বরিশালে ভুক্তভোগীর সংখ্যা এত বেশি হওয়ার কারণ সেখানে একজনের বিরুদ্ধে ১১টি শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। জেলার বাকেরগঞ্জে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য চার বছরে ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থীদের একাধিকবার ধর্ষণ করে ভিডিও চিত্র ধারণ করেন। এ ঘটনায় ২৮ অক্টোবর মামলা হয়।

শ্রমঘন এলাকায় কেন ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটে—এ বিষয়ে অপরাধবিজ্ঞানের শিক্ষক ফারজানা রহমান বলেন, এসব এলাকায় প্রান্তিক মানুষের বাস। তাদের নিরাপত্তার বেশ ঘাটতি রয়েছে।

ধর্ষকেরা পরিচিত

আইন সংশোধনের পর এক মাসে ধর্ষণের ঘটনায় আসামি করা হয়েছে অন্তত আড়াই শ জনকে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে ১৭২ জন বা ৬৯ শতাংশ। আসামিদের এক–চতুর্থাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে।

অভিযুক্তদের বেশির ভাগই ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর পরিচিত, প্রতিবেশী, আত্মীয়, প্রেমিক ও স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক। অপরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮ জন। মুদিদোকানি, সেলুনের কর্মী, ইজিবাইকচালক, বাসচালক, চালকের সহকারী, রিকশাচালক, কবিরাজ, সবজি বিক্রেতা, ফায়ার স্টেশনকর্মী, পুলিশ সদস্য, বিজিবি সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী, সরকারদলীয় নেতা ও কিশোরের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সহায়তাকারী হিসেবে কমপক্ষে তিনজন নারীর বিরুদ্ধে এ সময় অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণচেষ্টা করা হয় ১১ জন নারী ও শিশুকে।

নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণকারী পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণারত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী রুচিরা তাবাসসুম বলেন, ধর্ষণের মূল কারণ হচ্ছে নারী-পুরুষের ক্ষমতার বৈষম্য। এ ক্ষমতার কারণে পুরুষেরা ধর্ষণকে অপরাধ মনে করে না, বরং অধিকার মনে করে। সমাজের এই মূল সমস্যার সমাধান না হলে শুধু আইন দিয়ে ধর্ষণ ঠেকানো যাবে না।

মামলা তুলে নিতে চাপ

মাদারীপুরে গত ১৩ অক্টোবর এক গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত তিন আসামি কারাগারে রয়েছেন। তবে মামলা তুলে নিতে আসামিপক্ষের লোকজন নানাভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আসামিপক্ষের লোকজনের ভয়ে তিনি মাদারীপুরের বাড়িতে যেতে পারছেন না।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে স্বামীকে জিম্মি করে গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা করে বেকায়দায় রয়েছে ভুক্তভোগীর পরিবার। আসামিপক্ষ মামলা তুলে নিতে বারবার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে ভুক্তভোগীর পরিবার নিরাপত্তা চেয়ে জগন্নাথপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে।

নোয়াখালীর চাটখিলে অস্ত্রের মুখে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণের আলোচিত ঘটনায় ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক মজিবুর রহমান (শরীফ) কারাগারে রয়েছেন। তবে মামলার বাদী ভুক্তভোগী নারী আসামিপক্ষের লোকজনের ভয়ে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ৩ নভেম্বর ১২ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে প্রতিবেশী কামাল ব্যাপারীর (২৮) বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল খায়ের বলেন, ‘আমি কামাল ব্যাপারীকে জানালাম ধর্ষণের সাজা এখন মৃত্যুদণ্ড। দেখলাম সে বিষয়টি জেনেও নির্বিকার।’ তিনি বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত ধর্ষকদের মধ্যে অনুতাপ দেখিনি। খুবই নিচু মানসিকতার অসুস্থ প্রকৃতির মানুষ এরা।’

বিজ্ঞাপন

২০১৮ সালে ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার ১৫ বছরের ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের ছয় ধরনের অপরাধের মামলার বিচারসংক্রান্ত প্রথম আলোর এক দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব অপরাধে সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। গত মাসে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভকালে বিক্ষোভকারীরা বিচার না পাওয়াকে ধর্ষণের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, শাস্তির কঠোরতার সঙ্গে অপরাধ কমার সম্পর্ক নেই। শাস্তি যত কঠোর হয়, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার তত কমে। তাঁর মতে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে বিচার সুনিশ্চিত করতে হলে শুধু ধর্ষণ মামলাগুলো তদারকির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ থাকতে হবে। এই পুলিশেরা ধর্ষণ মামলার আলামত সংগ্রহ, ভুক্তভোগীকে আনা-নেওয়া, মামলার প্রক্রিয়া ও সাক্ষী নিশ্চিত করার মতো কাজগুলো করবে।

মন্তব্য পড়ুন 0