স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি কতটা ব্যাপক, তার বড় উদাহরণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আবজাল হোসেন ও গাড়িচালক আবদুল মালেক। করোনা মহামারির সময়েও স্বাস্থ্যের অনিয়ম এবং দুর্নীতি কতটা গভীর, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ করিম এবং জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ধরা পড়ার পর মানুষ তা নতুন করে জেনেছে। রিজেন্ট করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট
মানুষের হাতে ধরিয়ে দিত। আর জেকেজি করোনার নমুনা সংগ্রহের পর ড্রেনে ফেলে দিত। এরপর খেয়ালখুশিমতো কাউকে বলত করোনা পজিটিভ, কাউকে জানাত করোনা নেগেটিভ।

স্বাস্থ্যের আবজাল-রুবিনা

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, আবজাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রুবিনা খানমের সম্পদের বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি। উত্তরায় আবজাল ও তাঁর স্ত্রীর নামে বাড়ি আছে পাঁচটি। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৪টি প্লট ও ফ্ল্যাট আছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও বাড়ি আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনার নামে ওই অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে তাঁরা অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেন। অথচ আবজাল ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার একজন হিসাবরক্ষক। বরখাস্ত হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি সাকল্যে বেতন পেতেন ৩০ হাজার টাকা মতো। কিন্তু চড়তেন হ্যারিয়ার ব্র্যান্ডের গাড়িতে। তাঁর স্ত্রী রুবিন ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার স্টেনোগ্রাফার। স্বামী-স্ত্রী মিলে ‘রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিভিন্ন কাজের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন তাঁরা।

দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গত বছরের ২৬ আগস্ট আবজাল হোসেন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর স্ত্রী রুবিনা এখনো পলাতক।

দুদকের এক মামলায় এই দম্পতির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অর্জিত ২৬৩ কোটি ৭৬ লাখ ৮১ হাজার ১৭৫ টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। আরেক মামলায় আবজালের বিরুদ্ধে ২০ কোটি ৭৪ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকা অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়। এর সঙ্গে আছে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি হয় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে যন্ত্রপাতি কেনার নামে ওই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মামলাটি করে। এরপর আবজাল দম্পতির বিরুদ্ধে গত বছরের ২৭ জুন পৃথক দুটি মামলা করে দুদক। আসামিদের বিদেশ যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ করা এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করে দুদক। কিন্তু এখনো মামলার তদন্তই শেষ করতে পারেনি দুদক।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতেও রাজি হননি।

গাড়িচালক মালেক

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর আবদুল মালেক ওরফে বাদলকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। এরপরই দুর্নীতির অবিশ্বাস্য সব তথ্য বেরিয়ে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মালেক ও তাঁর স্ত্রী নার্গিস বেগমের নামে ঢাকার একটি মৌজাতেই সাতটি প্লট ও ডেইরি ফার্মের সন্ধান পায় দুদক। এর মধ্যে দুটি প্লটে বহুতল ভবন রয়েছে।

এই দম্পতির বিরুদ্ধে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুদক দুটি মামলা করে। দুজনের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৯৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয় দুই মামলায়। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে জেলগেটে মালেককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের সহকারী পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

মালেক ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলের গাড়িচালক। তাঁর উত্থানের পেছনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আনুকূল্য ছিল। এমনকি চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতি এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগেও তাঁর হাত ছিল বলে অভিযোগ আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেই নিজ পরিবারের সাতজনকে চাকরি দেন তিনি। মালেকের দুই স্ত্রী। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রাবেয়া খাতুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইব্রেরির কর্মী। কার্যত মালেককে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতি গাড়িচালক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর আবদুল মালেককে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। তাঁর কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, দেড় লাখ জাল বাংলাদেশি টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে র‍্যাব অবৈধ অস্ত্র ও জাল নোট ব্যবসার অভিযোগে দুটি মামলা করে। পরে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় র‍্যাব। মামলার বিচার চলছে।

নাম না প্রকাশের শর্তে দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা গত সপ্তাহে প্রথম আলোকে বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মালেককে রিমান্ডে নেওয়া হবে।

রিজেন্ট ও জেকেজির জালিয়াতি

গত বছর করোনা মহামারির শুরুর দিকে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হন ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ করিম ও জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ও তাঁর স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী। রিজেন্ট করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিত। আর জেকেজি করোনার নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করে ড্রেনে ফেলে দিত।

গ্রেপ্তারের পর সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, প্রতারণা, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫০টির মতো মামলা হয়। এর মধ্যে দুদক মামলা করে দুটি।

একটি মামলার অভিযোগে দুদক বলেছে, রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদসহ চারজনের বিরুদ্ধে এনআরবি ব্যাংকের দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্যপ্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন। অপর মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ছয় বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন ছিল না রিজেন্ট হাসপাতালের। সেই হাসপাতালের সঙ্গে কোভিড চিকিৎ​সায় চুক্তি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই অবৈধ চুক্তির ওপর ভর করেই করোনায় আক্রান্ত রোগীদের নমুনা বিনা মূল্যে পরীক্ষা করে অবৈধ পারিতোষিক বাবদ ১ কোটি ৩৭ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেন মো. সাহেদ। কিন্তু মামলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে সাহেদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের চার কর্মকর্তাকে আসামি করে দুদক। মামলা দুটির তদন্ত চলছে ধীরগতিতে।

সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা দুটির বাদী ছিলেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক মো. সিরাজুল হক। এখন তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন উপসহকারী পরিচালক মো. শাহজাহান মিরাজ। গত সপ্তাহে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসলে লকডাউনের কারণে আমরা আটকা পড়ে আছি। অফিস খুললে আবার কার্যক্রম শুরু করব। আশা করি, এক-দেড় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ হবে।’

এদিকে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) করা এক মামলায় সাহেদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিচারক। এ মামলায় সাহেদ এখন কারাগারে আছেন।

অবশ্য দুদকের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্য ১৮০ কর্মদিবস নির্ধারিত আছে। করোনা মহামারির সময় বাদ দিলে আশা করি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হবে।’

সাবরিনার সম্পদের খোঁজে দুদক

করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা না করেই জাল রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার (জেকেজি হেলথ কেয়ার) চেয়ারম্যান সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে গত বছরের ১২ জুলাই। মামলা করার ৪২ দিনের মাথায় ঢাকার সিএমএম আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিএমপি)।

কিন্তু ওই ঘটনার প্রায় এক বছর পরও সাবরিনার বিরুদ্ধে দুদক কোনো মামলা করেনি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধান পর্যায়েই রয়ে গেছে। অনুসন্ধানের দায়িত্বে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক সেলিনা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অনুসন্ধান চলমান আছে।

স্বাস্থ্যের আলোচিত দুর্নীতির মামলাগুলোর তদন্তে ধীরগতির জন্য ‘গাফিলতি ও লোকবলের অভাব’ বলে উল্লেখ করেছেন দুদকের কমিশনার মো. জহুরুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তের ঘাটতির কারণে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া যায়নি। এর জন্য লোকবলের অভাবও দায়ী। এখন দুদকে মামলার সংখ্যা ৭ হাজার, কিন্তু কর্মকর্তা আছেন ২০০ জন। অনুমোদন থাকার পরও এত দিন লোক নিয়োগ করা হয়নি।

করোনাকালে স্বাস্থ্যের অনিয়ম–দুর্নীতির ১৫টি ঘটনার অনুসন্ধান এখন দুদকে চলমান রয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতির ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রায় ২০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার তদন্ত চলছে। এখনো কোনোটি বিচারের পর্যায়ে যায়নি।

এসব বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘লোকবলের ঘাটতি থাকুক, আর গাফিলতি থাকুক, এ ধরনের আলোচিত দুর্নীতির মামলার তদন্ত দ্রুত সঙ্গে শেষ করা উচিত। আমরা মনে করি, এই ধীরগতির সঙ্গে সদিচ্ছার অভাবও রয়েছে। এখানে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু তাঁদের জবাবদিহির বিষয় নয়, দুদকেরও জবাবদিহির বিষয় আছে।’