default-image

রাজধানীর আদাবরের যে হাসপাতালে মারধর করার পর বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আনিসুল করিম মারা যান, সেটি চলছিল অবৈধভাবে।

মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন নামের বেসরকারি এই হাসপাতাল মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্র হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়েছিল। তবে চিকিৎসা হতো মানসিক রোগের। এ ধরনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। হাসপাতালটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করেছিল, তবে অনুমোদন পায়নি।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, সেখানে চিকিৎসার জন্য সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিৎসক থাকতেন না। নতুন রোগী এলেই হাত পিছমোড়া করে বেঁধে একটি ঘরে আটকে রাখতেন হাসপাতালের কর্মীরা। নিচতলায় পেছনের দিকে একটি কক্ষে কম্পিউটার ও সাউন্ড সিস্টেম দেখা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, রোগীকে মারধরের সময় সেখানে উচ্চ শব্দে গান বাজানো হতো, যাতে চিৎকার বাইরে থেকে শোনা না যায়।

মাইন্ড এইড হাসপাতালে সোমবার দুপুরে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকে ভর্তি করতে যান তাঁর স্বজনেরা। সেখানেই তাঁকে মারধর করেন হাসপাতালটির কর্মীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি নিস্তেজ হয়ে যান। পরে তাঁকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে চিকিৎক মৃত ঘোষণা করেন। মারধরের ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

এ ঘটনায় গত সোমবার রাতে আনিসুলের বাবা ফাইজুদ্দীন আহম্মেদ বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে হাসপাতালটির মালিক ও পরিচালনা কমিটির সদস্যসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়। পুলিশ হাসপাতালটির মালিকদের ১ জনসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে ১০ জনকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। দুপুরে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, মাইন্ড এইড একটি ভুঁইফোড় হাসপাতাল। মালিকেরা অবৈধভাবে মানসিক রোগীর চিকিৎসার নামে বাণিজ্য করে আসছিলেন।

তিনি বলেন, হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও নেই।

গতকাল বিকেলে পুলিশ হাসপাতালটি সিলগালা করে দেয়। সেটি যে অবৈধ ছিল, তা নিশ্চিত করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ইনফরমেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) ও মুখপাত্র হাবিবুর রহমান এবং ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান। হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসাকেন্দ্র চালাতে গেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিতেই হবে।

মামলায় যা আছে

আনিসুল করিমের বাবার করা মামলার বিবরণে বলা হয়, চার দিন ধরে আনিসুল কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছিলেন না। এ কারণে পরিবারের সবার মত নিয়ে সোমবার তাঁকে ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে আনিসুল ‘ওয়াশ রুমে’ (শৌচাগার) যেতে চান। তখন হাসপাতালের তিন কর্মী তাঁকে দোতলায় নিয়ে ভেতরে কলাপসিবল গেট লাগিয়ে দেন।

বিবরণে আরও বলা হয়, হাসপাতালের ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজন চিকিৎসা করার নামে তাঁকে মারতে মারতে বিশেষ কক্ষে ঢোকান। তাঁরা আনিসুল করিমকে জোর করে উপুড় করে ফেলে তিন-চারজন মিলে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেন। কয়েকজন কাপড় দিয়ে আনিসুলকে পিছমোড়া করে বেঁধে কনুই দিয়ে পিঠ, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। কিছুক্ষণ পর আনিসুল নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর এক আসামি স্বজনদের নিচতলা থেকে দোতলায় ডেকে নেন। স্বজনেরা গিয়ে আনিসুলকে নিস্তেজ অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

মামলায় অভিযোগ করা হয়, হাসপাতালটি মালিক ও পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. নিয়াজ মোর্শেদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, সাখাওয়াত হোসেন, সাজ্জাদ আমিন ও ফাতেমা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চিকিৎসা দেওয়ার নামে অর্থ উপার্জনের জন্য অবৈধ ও অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। হাসপাতালের মালিকদের পৃষ্ঠপোষক ও প্ররোচনায় আসামিরা পরিকল্পিতভাবে আনিসুলকে হত্যা করেছেন।

পুলিশ গতকাল রাত পর্যন্ত মাইন্ড এইড হাসপাতালের অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদ, ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বির, কথিত ফার্মাসিস্ট তানভীর হাসান, ওয়ার্ডবয় জোবায়ের হোসেন, তানিফ মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম চন্দ্র পাল, লিটন আহাম্মদ, সাইফুল ইসলাম ও শেফ মো. মাসুদকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের সবাইকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। নিয়াজ মোর্শেদকে গতকাল বিকেলে ঢাকার আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি নিজেও একজন চিকিৎসক। তাঁকে হাসপাতালেই রাখা হয়েছে।

এদিকে গতকাল ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে আনিসুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যুর কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর শরীরের কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের পরীক্ষাগার ও ভিসেরা পরীক্ষার জন্য মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা যাবে।

সরেজমিনে হাসপাতাল

মাইন্ড এইড হাসপাতালটি বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির ২ নম্বর রোডের তিন তলা একটি ভবনে। গতকাল দুপুরে গিয়ে দুজন নারী বাবুর্চিকে পাওয়া যায়। তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালটি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকার বিষয়টিও জানান তাঁরা। বাবুর্চিরা আরও জানান, গত সোমবার হাসপাতালটিতে ১৪ জন রোগী ছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর পরপরই ১৩ জন চলে গেছেন। হাসপাতালের দোতলায় পাওয়া যায় আরিফুল হক চৌধুরী নামের এক রোগীকে। তিনি জানান, পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকে মারধরের সময় তিনি পাশের একটি কক্ষে ছিলেন। তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি শুনেছেন।

আনিসুলকে যে কক্ষে মারধর করা হয়, সেটির দেয়ালে ফোম লাগানো। মেঝেতে দুটি জাজিম রয়েছে। হাসপাতালের একজন কর্মচারী জানান, কোনো রোগী অস্বাভাবিক আচরণ করলে ওই কক্ষে ঢুকিয়ে মারধর করা হতো। কক্ষটিতে সিসি ক্যামেরাও দেখা যায়। হাসপাতালের উল্টো দিকের একটি বাড়ির মালিক শরিফুল ইসলাম। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বছর দু-এক আগে হাসপাতাল ভবনের মালিক জাফর আহমেদ মারা যান। তিন মাস আগে তাঁর ছেলেরা ভবনটি হাসপাতাল হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন। তাঁরা থাকেন গুলশানে।

আনিসুলকে ‘হত্যার’ প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে মাইন্ড এইড হাসপাতালের সামনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেন। উল্লেখ্য, আনিসুল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। গতকাল গাজীপুর মহানগরের রাজবাড়ি মাঠে জানাজা শেষে সরকারি গোরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। জানাজায় কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমানত হোসেন খান ও মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আজাদ মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য পড়ুন 0