default-image

ভারতে বেড়াতে গিয়ে খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত বাংলাদেশি তরুণ বাদল ফরাজির সাজা কোন দেশের নিয়মে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে সরকার। ফলে দুই বছর আগে দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও মুক্তি পাননি ওই তরুণ। তিনি এখন কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।

বাদল ফরাজির বয়স এখন ৩১। ১৮ বছর বয়সে তিনি ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। যে খুনের মামলায় তাঁর সাজা হয়েছে, সেটি হয়েছিল তিনি ভারতে যাওয়ার আগে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকের নথিতে তাঁকে নির্দোষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমস্যা হলো, বন্দী বিনিময় চুক্তির আওতায় নাগরিকের সাজা দেশে এনে কার্যকর করতে হয়। কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ভারতের পেনাল কোড অনুযায়ী বাদলের সাজা ১৪ বছর। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ ৩০ বছর। এখন কোন আইনে তাঁর সাজা কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট নয়।

সরকার যদি বুঝতে পারে বাদল ফরাজি নির্দোষ, তবে বিশেষ ক্ষমা করতে পারে। ভারত সরকারকে চিঠিও লিখতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।
শাহদীন মালিক আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

বাদল ফরাজি ভারতে হাজতবাস, রেয়াত ও দণ্ড মিলিয়ে মোট সাজা ভোগ করেছেন ১০ বছর ৭ মাস। অন্যদিকে বাংলাদেশে রেয়াত যোগ করে তাঁর সাজা খাটা হয়েছে ২ বছর ৭ মাস ১২ দিন। দুই দেশ মিলিয়ে বাদল ফরাজি সাজা খেটেছেন ১৩ বছর ২ মাসের বেশি। ভারতীয় আইন অনুযায়ী, যাবজ্জীবন যদি ১৪ বছর হয়, তাহলে তাঁর মুক্তি বেশি দূর নয়। এর আগে দরকার কোন দেশের আইনে সাজা, সেটির সুরাহা করা।

বিজ্ঞাপন
‘দেখি আইন মন্ত্রণালয় কী বলে। এরপরই বলতে পারব তাঁর মুক্তি কবে হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান

এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেখি আইন মন্ত্রণালয় কী বলে। এরপরই বলতে পারব তাঁর মুক্তি কবে হবে।’

‘যদিও বিষয়টি আদালতের, তবু আমাদের কাছে মতামত চাইলে আমরা যৌক্তিক মতামতই দেব।’
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক

অবশ্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, প্রস্তাবটি তাঁর হাতে এখনো পৌঁছায়নি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যদিও বিষয়টি আদালতের, তবু আমাদের কাছে মতামত চাইলে আমরা যৌক্তিক মতামতই দেব।’

বাদল ভারতে গিয়েছিলেন ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই। এর প্রায় দুই মাস আগে (৬ মে) দিল্লির অমর কলোনিতে এক বৃদ্ধা খুন হন। বিভিন্ন সময় ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বলছে, বেনাপোল সীমান্ত পার হতেই বাদল ফরাজিকে বাদল সিং ভেবে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট বাদল ফরাজিকে দিল্লির সাকেত আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায়ের বিরুদ্ধে দিল্লির হাইকোর্টে আপিল করা হয়। সেখানেও নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকে। বাদলের জীবন কাটছিল দিল্লির তিহার কারাগারে। সেখানে তিনি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন।

একপর্যায়ে বন্দীদের কাউন্সেলিং করতে যাওয়া মানবাধিকারকর্মী রাহুল কাপুরের সঙ্গে কথা হয় বাদল ফরাজির। শুরু হয় ‘জাস্টিস ফর বাদল’ শীর্ষক একটি স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি। রাহুল ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করেন। সরকারের চেষ্টার পর ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ভারত তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

বাদলের বাড়ি বাগেরহাটে। তাঁর মা শেফালি বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনিও বলেছেন আমার ছেলে নির্দোষ। তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করবেন। এটা ছয় মাস আগের কথা। আর কিছু জানি না।’

বাদলকে দেশে আনার পর সরকার কয়েক দফায় সাধারণ ও ২০ বছর সাজা খাটা বন্দীদের একটি অংশকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু বাদলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যদি বুঝতে পারে বাদল ফরাজি নির্দোষ, তবে বিশেষ ক্ষমা করতে পারে। ভারত সরকারকে চিঠিও লিখতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না, বরং অবহেলা দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন