default-image

২০-দলীয় জোটের ডাকা হরতাল-অবরোধের মধ্যে গতকাল রোববার বিকেলে জয়পুরহাট শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদ চত্বরে ১৪-দলীয় জোটের সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ১৯ নেতা-কর্মী আহত হন। এঁদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ঘটনার পর জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আগুন দেন ১৪ দলের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা।
এদিকে নাশকতাকারীদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ আরেক পরিবহনশ্রমিক মো. বাপ্পী মিয়া গতকাল মারা গেছেন। ১০ দিন আগে রাজধানীতে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়েছিলেন বাপ্পী।
টানা অবরোধের ৪৯তম দিনে গতকাল সকালে রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন এক কলেজছাত্রী। সিলেটে গতকাল সকালে ট্রেন লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। আর আগের রাতে জয়পুরহাটে পেট্রলবোমা হামলা চালানো হয় একটি ট্রাকে।
৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি থেকে চলছে এ অবরোধ কর্মসূচি। তবে দুই দিন আগেই শুরু হয় সহিংসতা। ক্রসফায়ারে নিহত ৩০ জনসহ সহিংসতায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ১০২ জন; আহত ব্যক্তির সংখ্যা সহস্রাধিক। আগুন দেওয়া হয়েছে ৫৯০টি যানবাহনে এবং ভাঙচুর করা হয়েছে আরও ৫৭৯টি।
১৪ দলের সমাবেশে ককটেল: সহিংসতা ও পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জয়পুরহাট শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদ চত্বরে মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে জেলা ১৪ দল। সমাবেশে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ আবু সাঈদ আল মাহমুদ বক্তব্য দেওয়ার সময় বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে মঞ্চের সামনে পর পর দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। তখন নেতা-কর্মীরা চারদিকে ছোটাছুটি করতে থাকেন। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত জয়পুরহাট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী রেবেকা সুলতানা, সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আসমা বেগম, আওয়ামী লীগ কর্মী সদর উপজেলার খাস পাহনন্দার বাবুল হোসেন ও হাবিল উদ্দিন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
জয়পুরহাট জেলা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সাইদুর রহমান জানান, গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়ায় পাঠানো হয়েছে। অন্যদের জয়পুরহাট হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।
বিস্ফোরণের পর ১৪ দলের বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা মঞ্চের পশ্চিম পাশে অবস্থিত জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিভিয়ে ফেলেন।
আওয়ামী লীগ নেতা আবু সাঈদ আল মাহমুদ অভিযোগ করেন, বিএনপি-জামায়াত সারা দেশে নাশকতার অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও এই হামলা চালিয়েছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সাংসদ মোজাহার আলী প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে ২০-দলীয় জোটের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত নন। বরং ১৪ দলের সন্ত্রাসীরাই ককটেল হামলা করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার ষড়যন্ত্র করছে। তারা অন্যায়ভাবে বিএনপির কার্যালয়ও পুড়িয়ে দিয়েছে। জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার আবু কালাম সিদ্দিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের দেখতে যান। তিনি জানান, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
মারা গেলেন আরেকজন: গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মারা যান ২৬ বছর বয়সী বাপ্পী। ১২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনশ্রীতে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়েছিলেন তিনি।
বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে গিয়ে দেখা যায় বাপ্পীর স্ত্রী রিনা আক্তার বিলাপ করছেন ‘কপালে নাই, আমার কপালে স্বামীর সোহাগ নাই। পোলাপানডি তো এহনও বুজে না বাপে কী জিনিস। তার আগেই আল্লা তারে নিয়া গেলা।’ বাপ্পীর পাঁচ বছর বয়সী একটি মেয়ে ও দেড় বছরের ছেলে রয়েছে।
স্বজনেরা জানান, বাপ্পী আলিফ পরিবহন নামের একটি পরিবহন সংস্থায় কাজ করতেন। বাসটি মিরপুর থেকে বনশ্রী পথে চলাচল করে। ১২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে বনশ্রীর প্রধান সড়কের ফটকে বাসটিতে পেট্রলবোমা হামলা হয়। বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা চালকের সহকারী (হেলপার) বাপ্পীর পুরো শরীরে মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ধরে যায়। শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া অবস্থায় বাপ্পীকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় বাপ্পীকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। ১০ দিন পর গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাপ্পীর মা হালিমা বেগম বলেন, বাপ্পীর বাবা দুলাল মিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ। বাপ্পীর আয়েই সংসারটি চলত। অসুস্থ থাকা অবস্থায় শুধু ১০ হাজার টাকা ছাড়া আর কোনো সাহায্য পাননি তাঁরা।
ময়নাতদন্ত শেষে বাপ্পীর লাশ গতকাল বিকেলে মিরপুরের দিয়াবাড়ি বালুর মাঠে নেওয়া হয়। এরপর লাশ দাফনের জন্য গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের শ্রীরামপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে তরুণকে পিটুনি: রাজধানীর রামপুরায় গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগে সুমন নামের এক তরুণকে ধরে পিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে জনতা। গতকাল রাতে এ ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে জানানো হয়, রাত সাড়ে নয়টার দিকে রামপুরার আবুল হোটেলের সামনে একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে আগুন নেভান।
ঢাকার বাইরে আরও নাশকতা: সিলেট রেলস্টেশনের কাছে গতকাল বেলা ১১টার দিকে আন্তনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেন লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। তবে নিক্ষিপ্ত ককটেল ট্রেনে পড়েনি। সিলেট রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক আবদুর রাজ্জাক জানান, জয়ন্তিকা সিলেট রেলস্টেশন থেকে সকাল সোয়া আটটায় ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে সেটি বেলা ১১টায় ছাড়ে। মূল স্টেশন অতিক্রম করার সময় ট্রেনের পাশেই পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। তখন ট্রেনটি না থেমেই গন্তব্যে রওনা করে।
জয়পুরহাট-বগুড়া সড়কের জয়পুরহাট সদর উপজেলার হিচমি বাজার এলাকায় গত শনিবার রাত পৌনে নয়টার দিকে পণ্যবোঝাই একটি মিনি ট্রাকে পেট্রলবোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। ট্রাকের চালক সায়মন হোসেন জানান, রংপুরের তারাগঞ্জ থেকে আসবাব নিয়ে কালাই উপজেলা সদরে যাচ্ছিলেন। ট্রাকটি হিচমি বাজারে পৌঁছামাত্র ১৫-২০ জন দুর্বৃত্তের দল পাঁচ-ছয়টি ককটেল ফাটায়। এরপর তারা পেট্রলবোমা ছুড়লে ট্রাকের সামনের গ্লাস ভেঙে আগুন ধরে যায়। আগুনে আসবাবসহ ট্রাকটির সামনের অংশ পুড়ে যায়।
গাজীপুরে ভাওয়াল রাজবাড়িস্থ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চত্বরে অবস্থিত জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের সামনে থেকে গতকাল সকাল আটটার দিকে একটি বোমাসাদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়।
মামলা: ময়মনসিংহ শহরের গঙ্গাদাস গুহ সড়কে অবস্থিত বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের পৈতৃক বাড়িতে শনিবার রাতে ককটেল হামলার ঘটনায় মামলা করেছে পুলিশ। এতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি রোকনুজ্জামান ও যুবদলের সভাপতি শামীম আজাদসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও একটি গ্যারেজে থাকা সাতটি অটোরিকশা পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় বিএনপির ছয় নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন