২১ আগস্ট হামলা

৪১ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চায় রাষ্ট্রপক্ষ

বিজ্ঞাপন
default-image
>
  • বিচার শেষ পর্যায়ে। সেপ্টেম্বরে রায় হতে পারে।
  • এখন চলছে সর্বশেষ আসামি বাবরের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন।

১৪ বছর আগে এই দিনে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়। ওই ঘটনায় করা দুই মামলার বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রাষ্ট্রপক্ষ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ৪১ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আদালতে আবেদন জানিয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা মনে করছেন, আগামী মাসে মামলার রায় হতে পারে। এখন সর্বশেষ আসামি লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে।

ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিশেষ এজলাসে সপ্তাহে তিন দিন করে মামলার কার্যক্রম চলছে। মামলায় মোট সাক্ষী করা হয় ৪৯১ জনকে। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ২২৫ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছে। আসামিপক্ষে হাজির করা হয় ১২ জন সাক্ষী। এই মামলায় তারেক রহমান ও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছেন। তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলছে।

এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে। এখন আসামি বাবরের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ এক বা দুই দিন আইনগত জবাব দেবে। রাষ্ট্রপক্ষ যেদিন শেষ করবে, আইন অনুযায়ী ওই দিনই আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করবেন। রেজাউর রহমান বলেন, ‘বাবরের বাকি যুক্তিতর্ক যদি চার থেকে সাত কার্যদিবসে শেষ হয়, তাহলে সেপ্টেম্বরে রায় হবে বলে আশা করছি।’

এর আগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে তারেক, বাবর, পিন্টুসহ ৪১ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে মানুষ হত্যা, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা, পরিকল্পনা ও সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। বাকি আটজনের বিরুদ্ধে আনা হয় কর্তব্যকাজে অবহেলা, আলামত নষ্ট, তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা এবং আসামিকে দেশত্যাগের সহযোগিতা করার অভিযোগ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন সাবেক আইজিপিসহ পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তা ও তিনজন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সিআইডির সাবেক কর্মকর্তা। এই আটজনের পাঁচ থেকে সাত বছর কারাদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। এতে ২২ জন নিহত হন। আহত হন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শতাধিক ব্যক্তি।

default-image

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাস্তবে এই ঘটনার কোনো তদন্ত হয়নি বা তদন্ত করতে চায়নি। উল্টো তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা করা হয়। আদালতে সাজানো জবানবন্দি আদায় করে ‘জজ মিয়ার গল্প’ হাজির করা হয়েছিল। ২০০৭ সালে এক-এগারোর পটপরিবর্তনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে এই ঘটনায় নতুন করে তদন্ত শুরু করে। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীর ছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি ২০০৮ সালের জুনে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন এবং নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। তাতে বলা হয়, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে। গ্রেনেড সরবরাহকারী হিসেবে তাজউদ্দিনের নাম আসে।

অবশ্য এই হামলার পরের বছর ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর হুজির অন্যতম শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানকে ঢাকার বাড্ডা থেকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। এরপর বিভিন্ন মামলায় ১২০ দিন রিমান্ডে ছিল হান্নান। তখন টিএফআই (টাস্ক ফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলে মুফতি হান্নান যে জবানবন্দী দেন তাতে অন্যান্য হামলার পাশাপাশি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাও বিস্তারিত বলেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার ২১ আগস্টের হামলা ছাড়া বাকি ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক আদায় করে। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২১ আগস্ট হামলার বিষয়ে মুফতি হান্নান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।

সম্পূরক অভিযোগপত্র

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই মামলার বিচার শুরু হয়। এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষ মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য আদালতে আবেদন করে। আদালতের অনুমোদনের পর সিআইডির কর্মকর্তা আবদুল কাহ্হার আকন্দ অধিকতর তদন্ত করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন। তাতে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াতের নেতা মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করা হয়। এ নিয়ে হত্যা মামলায় মোট আসামি হয় ৫২ জন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলায় ৪১ জন।

এর মধ্যে আসামি মুফতি হান্নান ও তাঁর সহযোগী শরীফ শাহেদুল ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়। ফলে এখন হত্যা মামলার আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯। আর বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় আসামি ৩৮ জন।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমানকে আসামি করা হয় আদালতে গ্রেনেড হামলার প্রধান আসামি মুফতি হান্নানের দ্বিতীয় দফা দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে। তাতে বলা হয়, ২০০৪ সালের প্রথম দিকে বনানীর হাওয়া ভবনে গিয়ে তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত হন। তখন মুফতি হান্নান শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যাসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা চান। তারেক রহমান উপস্থিত সবার সামনে সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এরপর ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে মুফতি হান্নান ও তাঁর সহযোগীরা জানতে পারেন যে সিলেটে গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ঢাকার মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ সমাবেশ করবে। তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, সেখানে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর আক্রমণ করবেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মুফতি হান্নান আগস্টের মাঝামাঝি একদিন হরকাতুল জিহাদের নেতা মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা তাজউদ্দিনসহ আল মারকাজুল ইসলামের একটি মাইক্রোবাসে করে হাওয়া ভবনে যান। তাঁরা সেখানে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, এনএসআইয়ের (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা) তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহিম, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার (পরে মেজর জেনারেল) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হামলা করে হত্যা করার সহযোগিতা চান। তারেক রহমান সবার সামনে মুফতি হান্নান ও তাঁর সহযোগীদের সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

পলাতক ১৮, কারাগারে ২৩ জন

এই মামলায় তারেকসহ ১৮ জন আসামিকে পলাতক দেখানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জনের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। পলাতক বাকি চারজনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির অভিযোগ নেই, তাই তাঁদের জন্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। এই চারজন হলেন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন উদ্দিন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক উপকমিশনার ওবায়দুর রহমান খান। এই মামলায় বাবর, পিন্টুসহ ২৩ জন আসামি কারাগারে আছেন। পুলিশের সাবেক ছয়জন কর্মকর্তা এবং খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান জামিনে আছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন