default-image

রাজধানীর লাজ ফার্মায় গত এপ্রিল-মে মাসজুড়ে রাবারের ১০০টি গ্লাভসের একটি বাক্স ৮০০ টাকা বিক্রি হয়। এতে একটি গ্লাভসের দাম পড়ে ৮ টাকা। একই গ্লাভস বাংলাদেশ রেলওয়ে কিনেছে ৩২ টাকায়।

করোনাকালের শুরুতে রেলওয়ে গ্লাভস ছাড়াও মাস্ক, থার্মোমিটার, জীবাণুনাশক টানেল, সাবানসহ বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী কিনেছে। এ ক্ষেত্রে ব্যয় করেছে প্রায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সব পণ্যই বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে কেনার অভিযোগ উঠেছে।

রেলওয়ে এই সুরক্ষাসামগ্রী কিনতে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেনি। নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। জরুরি সময়ে এভাবে কেনাকাটা অবৈধ নয়। কিন্তু রেলের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, করোনার সুযোগ দিয়ে আসলে কেনাকাটার নামে রেলের টাকা ভাগাভাগি করা হয়েছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ আগস্ট যুগ্ম সচিব ফয়জুর রহমান ফারুকীকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। কমিটি ৫ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উচ্চ মূল্যে পণ্য কেনাকাটার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। কমিটি ২৯ কর্মকর্তাকে দায়ী করে ভবিষ্যতে তাঁদের এ ধরনের কেনাকাটায় সম্পৃক্ত না করার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মঞ্জুর উল আলম চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় সরঞ্জাম কর্তৃপক্ষের প্রধান রুহুল কাদের আজাদ রয়েছেন।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কিছু অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ এসেছে। ইতিমধ্যে একজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

রেলে কী দর, বাজারে কত

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, করোনার শুরুর দিকে কিছু কিছু পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। তবে রেল যে দামে কিনেছে, তা অস্বাভাবিক।

যেমন করোনার শুরুর দিকে সাবানের দাম খুব একটা বাড়েনি। তবে রেল একেকটি ‘মিনি সাবান’ ২৫ টাকায় কেনে, যা বাজারে ১০ টাকা ছিল। একইভাবে ১২০ টাকা কেজির গুঁড়া সাবান বা ডিটারজেন্ট ১৮৮ টাকা ও ১২০ টাকা কেজির ব্লিচিং পাউডার ১৯৩ টাকায় কেনা হয়। রেলের কেনাকাটায় আড়াই শ মিলিলিটার পরিমাণের এক বোতল জীবাণুনাশকের (হেক্সিসল) দাম পড়ে ৩৮৪ টাকা, অথচ এটির মোড়কে লিখিত মূল্য (এমআরপি) ১৩০ টাকা।

ঢাকার ফুটপাতে মে মাসে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় প্লাস্টিকের চশমা বিক্রি হয়, যা রেলের পক্ষ থেকে প্রতিটি ৩৯৭ টাকায় কেনা হয়। সার্জিক্যাল মাস্ক প্রতিটি ৪০ টাকা ও চীনের তৈরি কেএন-৯৫ মাস্ক ৭২৭ টাকায় কেনে রেল। যদিও এপ্রিল-মে মাসে কেএন-৯৫ মাস্ক অনলাইনে বিক্রি হয় ৪০০-৫০০ টাকায়। এ ছাড়া একই সময় রেল চীনা ইনফারেড থার্মোমিটার প্রতিটি ১২ হাজার ৩৪০ টাকা ও ট্রলি ও ফ্লুমিটারসহ প্রতিটি অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রায় ৪১ হাজার টাকায় কিনেছে।

করোনায় অনেক বেশি দাম দিয়ে সুরক্ষাসামগ্রী কেনার অভিযোগ। ২৯ কর্মকর্তাকে কেনাকাটা থেকে দূরে রাখার সুপারিশ তদন্ত কমিটির।

রেলের কেনাকাটায় পাঁচটি জীবাণুনাশক টানেলের (দরপত্রে নাম থার্মাল স্ক্যানার) প্রায় ৬২ লাখ টাকা, প্রতিটি প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা। সূত্র জানায়, মডার্ন প্রাইম কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান দুটি স্ক্যানার চুক্তির আগেই সরবরাহ করে।

তদন্ত কমিটি কোন পণ্য কত বেশি দামে কেনা হয়েছে তা বিস্তারিত উল্লেখ করেনি। তবে তারা দেখিয়েছে, একই পণ্য কেনায় ভিন্ন রকম দাম দেওয়া হয়েছে। এক দপ্তর যে মাস্ক (কেএন-৯৫) কিনেছে ৫৮৬ টাকায়, সেটি অন্য দপ্তরের জন্য কেনা হয়েছে ৭২৭ টাকায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান ফয়জুর রহমান ফারুকী প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি জানানো ছাড়া অন্য কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ভাগে ভাগে দরপত্র

রেলওয়ের নথিপত্র অনুসারে, রেলের পূর্বাঞ্চলের নয়টি বিভাগের চাহিদাপত্রের পর আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধান সরঞ্জাম দপ্তর ২১ থেকে ২৯ জুনের মধ্যে সুরক্ষাসামগ্রী কেনার জন্য ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৩৩টি কার্যাদেশ দেয়। কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কয়েকটির মালিক ইকবাল নামের এক ব্যক্তি। এ ছাড়া মিম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৬টি দরপত্র পায়, যার মোট মূল্য প্রায় ৮৯ লাখ টাকা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেনাকাটায় যুক্ত তিন থেকে পাঁচ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তাদের একটি দরপত্রের মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকার বেশি পণ্য কেনার অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার নেই। এ জন্যই ভাগ ভাগ করে একাধিক কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

এই কেনাকাটায় রেলের ২৯ জন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। শুরুতে বিভিন্ন বিভাগ থেকে চাহিদাপত্র আসে। বাজারদর যাচাই করেন তিনজন কর্মকর্তা। সেই দর উপস্থাপন করা হয় আরেক ঊর্ধ্বতন কর্তার কাছে। এরপর আরেকজন নথি উপস্থাপন করেন। প্রতিটি কার্যাদেশে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ছিল। বাজারদর অনুমোদন দেন একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। এরপর পণ্য ক্রয় করেন সরঞ্জাম দপ্তরের প্রধান।

ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশ অনেক পুরোনো। করোনার সময় দুই পক্ষই মওকা নিয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে দর অনুমোদনকারী মঞ্জুর আলম চৌধুরীকে চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। কেনাকাটা সম্পন্নকারী রুহুল কাদের আজাদ প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, করোনার শুরুর দিকে বাজারে পণ্যই ছিল না। ঠিকাদারও খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। এ জন্যই একক দরে জানাশোনা কিছু ঠিকাদারকে সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই পণ্য একাধিক কার্যাদেশে কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, তাড়াহুড়োর কারণে এমন করতে হয়েছে।

অবশ্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, কেনাকাটার সঙ্গে যুক্তরা নিজেদের পরিচিত ঠিকাদারের উল্লেখ করা দামেই পণ্য কিনেছেন। রেলের অনেকে ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারাও পান।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশ অনেক পুরোনো। করোনার সময় দুই পক্ষই মওকা নিয়েছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমনে বড় দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় ও লুটপাটে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0