‘মানষের বাড়িতে বদলা দিয়া পোলাটারে লেহাপড়া করাই, এহন ধারদেনা কইর‌্যা পোলারে উপজেলা সদরে এসএসসি পরীক্ষা দেতে পাডাইছি। এই জন্য স্কুলের স্যারেরা পরীক্ষার সময় থাকা ও খাওন বাবদ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা নেছে। এহন পরীক্ষা পিছাইয়্যা দেওনে স্যারেরা আরও হাজার দুই টাকা জোগাড় রাখতে কইছে। এই টাকা কোমনে গোনে জোগাড় করমু হেই চিন্তায় রাইতে ঘুমাইতে পারি না। কন, এত টাকা পামু কই?’

কথাগুলো বলছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার চরকগাছিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত বৃহস্পতিবার এভাবেই তিনি কথাগুলো বলেন।

টানা অবরোধ ও হরতালে বরগুনার প্রায় ১১ হাজার ৫০০ এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার্থী চরম বিপাকে পড়েছে। সবচেয়ে দুর্ভোগে পড়েছে গ্রামের দরিদ্র শিক্ষার্থীরা। এসব শিক্ষার্থী জেলা ও উপজেলা সদরে এসে বাড়ি ভাড়া করে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

গ্রামের এসব শিক্ষার্থীর বাড়ি থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রের দূরত্ব ২৫-৩০ কিলোমিটার। কখনো নৌকায়, কখনো কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে তাদের জেলা বা উপজেলা সদরে পরীক্ষা দিতে যাওয়া সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে পরীক্ষার সময়ে তারা সদরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের এ ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এ জন্য তারা অভিভাবকদের কাছ থেকে এক মাসের থাকা-খাওয়া খরচ বাবদ সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু ক্রমাগত পরীক্ষা পেছানোয় তাঁরা এখন শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আরও টাকা দিতে বলছে।  

চরকগাছিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরুল আমিন বলেন, ‘আগামী মাসের (মার্চ) ১০ তারিখ পর্যন্ত হিসাব করে (দৈনিক মাথাপিছু ৮০ টাকা হারে) প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আমরা ৫ হাজার ৫০০ টাকা করে নিয়েছি। এখন যে অবস্থা, তাতে পরীক্ষা কবে শেষ হবে তা অনিশ্চিত। তাই পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেব বাড়তি কত টাকা লাগবে। আমাদের তো কিছু করার নেই, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে এটা করতে হচ্ছে।’

তালতলী উপজেলার লাউপাড়া সাগর সৈকত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বছর ১৬৭ জন এসএসসি পরীক্ষার্থী। এসব পরীক্ষার্থী তালতলী শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে। শিক্ষার্থী মো. মহসিন বলে, ‘গরিব বাবা ধারদেনা করে পরীক্ষার জন্য তালতলী সদরে থাকা-খাওয়ার টাকা দিয়েছেন। আমার গরিব বাবা কীভাবে বাড়তি অর্থ জোগাবেন, তা ভাবতে পারছি না।’

আমতলী উপজেলার উত্তর সোনাখালী স্কুল ও কলেজের এএসসি পরীক্ষার্থী ৬৬ জন। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে আমতলী শহরে ভাড়া বাসায় থেকে তাদের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। বরগুনা সদর উপজেলার শিয়ালিয়া, নলী মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আমতলী-নিমতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ সদরের পশ্চিমাংশের ১০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীরখাল মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য পরীরখাল বাজার এলাকায় বাড়ি ভাড়া করে অবস্থান করছে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুকুমার চন্দ্র হালদার বলেন, ‘নির্বিঘ্নে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এখন হরতাল দিলে তো আমাদের কিছু করার নেই।’

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন