default-image

চলমান অবরোধে নাশকতা ঠেকাতে প্রায় সমান তালে চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘বন্দুকযুদ্ধ’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কথিত সড়ক দুর্ঘটনা ও গণপিটুনি। পাওয়া যাচ্ছে গুলিবিদ্ধ লাশও। আবার ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির সহযোগী দাবি করে নামে-বেনামে আসামি করে হত্যা মামলা করা হচ্ছে। নিহতের শরীরে মিলছে অসংখ্য গুলির ক্ষত।
গত ৫১ দিনের অবরোধে এই প্রক্রিয়ায় ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩৩ জন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায়’ চার আর ‘গণপিটুনিতে’ নিহত হন তিনজন। গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে সাতজনের।
একই সময়ে পেট্রলবোমা, আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণে মারা গেছেন ৫৭ জন। আর সহিংসতার শুরুর দিকে সংঘর্ষে মারা গেছেন চারজন।
‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ৩৩ জনের মধ্যে ১১ জন বিএনপি-ছাত্রদলের, ১০ জামায়াত-শিবিরের, পাঁচজন সন্ত্রাসী-ডাকাত, একজন চরমপন্থী (যুবলীগের সাবেক কর্মী) এবং একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিলেন। বাকি পাঁচজন বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এঁরা গাড়িচালক, মোজাইক মিস্ত্রি, কারওয়ান বাজারের কাঁচামালের ব্যবসায়ী, টায়ারের দোকানের কর্মী ও মুঠোফোন সারাই দোকানের কর্মী ছিলেন বলে তাঁদের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। পুলিশও তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। এঁদের প্রায় সবাইকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র এক দিন থেকে দুই সপ্তাহ আগে ধরে নেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারগুলোর দাবি। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, এঁরা নাশকতার সময় ধরা পড়েছেন। আগে গ্রেপ্তার হননি কিন্তু বন্দুকযুদ্ধের শিকার হয়েছেন এমন ঘটনাও আছে।
‘সড়ক দুর্ঘটনায়’ নিহত চারজনের বিষয়ে স্বজনদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে নিয়ে তাঁদের হত্যা করেছে। এ চারজনের মধ্যে দুজন যশোরের মনিরামপুরে বিএনপির কর্মী, একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছাত্রশিবিরের কর্মী এবং একজন কুমিল্লার স্থানীয় সন্ত্রাসী।
যে সাতজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ছয়জনই বিএনপি-ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একজনের পরিচয় জানা যায়নি।
আগে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেশাদার অপরাধী নিহত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক কর্মী। তবে এঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগে নাশকতার মামলা ছিল।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র্যাবের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো। তাঁরা বলেন, চলমান ভয়াবহ নাশকতা দমন করতেই কঠোরতম সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। নিষ্ঠুরতার প্রতিকার নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় হচ্ছে বলে যে সমালোচনা আছে, সে বিষয়ে তাঁরা ইতিমধ্যে তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্যকেই সমর্থন করেছেন। তাঁরা মনে করছেন, তাঁরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ছেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে থাকছেন। কারণ, এবারের সন্ত্রাসের লক্ষ্যই হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
গ্রেপ্তার, গুলি ও ক্রসফায়ারে নিরীহ কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কার বিষয়ে চলমান আলোচনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এই কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, নাশকতাকারী নিশ্চিত হয়েই তাঁরা পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচার ছাড়া মানুষ মারা হচ্ছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে গত বুধবার র্যাব সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে। পুলিশের ওপরে কেউ আক্রমণ করলে পুলিশ তার আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে। এ ক্ষেত্রে যদি কোনো ঘটনা ঘটে, সে ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদন্তের ব্যবস্থা আছে। পুলিশের জবাবদিহিতা সর্বত্র। আদালতের কাছে, জনগণের কাছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পুলিশকে জবাবদিহি করতে হয়।’
একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, এসব ‘বন্দুকযুদ্ধ’ পরবর্তীকালে তাঁদের পেশাগত মূল্যায়নে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রসঙ্গত, কর্মক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ কাজ ও সাহসিকতার জন্য সর্বশেষ পুলিশ-র্যাব কর্মকর্তাদের যে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ১৮ জনের কৃতিত্বপূর্ণ কাজের তালিকায় ছিল ‘বন্দুকযুদ্ধ’ও।
গত বছর নির্বাচনের আগে-পরে সহিংসতা দমনের জন্য ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১২৮ জন নিহত হন বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়।
গল্পে নতুন মাত্রা: ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে পুলিশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে বলা হচ্ছে, সহযোগীদের গুলিতেই মৃত্যু হয়েছে। এরপর পুলিশ সহযোগীদের নাম উল্লেখ করে বা অজ্ঞাতনামা সহযোগীদের আসামি করে হত্যা মামলা করা হচ্ছে।
৭ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর শ্যামলীতে ট্রাফিক পুলিশের একজন সার্জেন্টের ওপর হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে শিবিরের ছয়জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই রাতেই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন গ্রেপ্তার হওয়া মাদ্রাসাছাত্র জসীমউদ্দীন মুন্সী।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণেশ গোপাল বিশ্বাস স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তারের পরে জিজ্ঞাসাবাদে জসীম জানান, শিবিরের সন্ত্রাসীরা রাত তিনটা থেকে চারটার মধ্যে তালতলা নতুন রাস্তায় অবস্থান করবে। সে অনুযায়ী পুলিশ জসীমকে নিয়ে সেখানে গেলে সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ও ককটেল হামলা চালায়। একপর্যায়ে তারা জসীমকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পুলিশ পাল্টা ২১টি গুলি চালায়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের গুলিতেই জসীম মারা যান।
সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতেই জসীম মারা গেছেন, কিসের ভিত্তিতে এ দাবি করা হয়েছে—জানতে চাইলে গণেশ গোপাল বলেন, পুলিশ সেখানে শটগান দিয়ে গুলি চালিয়েছে। আর ময়নাতদন্তে নিহত ব্যক্তির শরীরে যে গুলি পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে পুলিশের ছোড়া গুলির মিল নেই। এ কারণেই বলা হচ্ছে, সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতেই মারা গেছে।
‘বন্দুকযুদ্ধে’ ‘সন্ত্রাসীদের’ গুলিতে নিহত হওয়ার প্রায় একই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে রাজধানীতে নিহত নড়াইলের জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েস, ছাত্রদল নেতা খিলগাঁওয়ের নুরুজ্জামান জনি, কেরানীগঞ্জের মুঠোফোন দোকানের কর্মী রাসেল সরদার, মিরপুরের শ্রমিক দলের নেতা আবদুল ওদুদ ব্যাপারী নিহত হওয়ার প্রতিবেদনে। প্রতিটি ঘটনাতেই পুলিশ একটি করে হত্যা মামলা করেছে।
গুলি বাড়ছে: ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ইমরুল কায়েসের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর শরীরে ১৯টি গুলির ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়। খিলগাঁও ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান জনির শরীরে ১৬টি গুলির চিহ্ন ছিল। সর্বশেষ গত রোববার রাতে মিরপুরে ‘গণপিটুনিতে’ নিহত তিনজনের শরীরে ৫৪টি (যথাক্রমে ২২, ১৫ ও ১৭টি) গুলির চিহ্ন দেখা গেছে।
এ ছাড়া সন্দেহ হলেই গুলির ঘটনাও ঘটছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মাগুরার শালিখায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন স্থানীয় শতখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা মশিয়ার রহমান (৫০)। তিনি পেশায় রংমিস্ত্রি। তাঁর স্বজন ও গ্রামবাসী জানান, শতখালী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন সংস্কারের ঠিকাদারি কাজ পেয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা। সারা দিন কাজ শেষে সন্ধ্যায় ছয়ঘরিয়া নতুন বাজারে বসে চা পানের সময় সেখানে পুলিশ এলে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। পুলিশ তাঁকে ধরে পায়ে গুলি করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়।
গুলিবিদ্ধ লাশ: গত ৫১ দিনে সাতজনের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে। গত ২৯ জানুয়ারি রাতে মিরপুর বেড়িবাঁধ থেকে বুকে-পিঠে ১০টি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছাত্রদলের নেতা আরিফুল ইসলামের (২৩) লাশ উদ্ধার হয়। তবে তাঁকে শনাক্ত করতে তিন দিন চলে যায়। তাঁর স্বজনেরা অভিযোগ করেন, ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি ভোলা যাওয়ার সময় ঢাকার সদরঘাটে কর্ণফুলী-৪ লঞ্চ থেকে আরিফুলকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। অবশ্য ডিবি অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
৪ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ভাষানটেকের একটি বালুর মাঠে গুলিবিদ্ধ এক তরুণের লাশ পাওয়া যায়। পাঁচ দিন হাসপাতাল মর্গে পড়ে থাকার পর পরিচয় মেলে। নাম জি এম মো. নাহিদ (২২), বাড়ি মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে। তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ভাগনে।
নিহত নাহিদের বাবা সাবেক সেনাসদস্য জি এম সাঈদ অভিযোগ করেন, ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর থেকে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে সাদাপোশাকে থাকা পুলিশের একটি দল (সিভিল টিম) নাহিদকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর পুলিশ নাহিদকে ছেড়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। পুলিশের সঙ্গে মুঠোফোনে তাঁদের দেনদরবারও হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগও দেন তাঁরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেলে লাশ।
৯ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের কালশী এলাকায় আরেক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ মেলে। তার পরিচয় এখনো মেলেনি।
নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ঝিনাইদহেও এমন গুলিবিদ্ধ লাশ মিলেছে চারটি। পরে দেখা গেছে, এরা সবাই বিএনপি ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব ঘটনা তখনই দেখা যাচ্ছে যখন দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা এমন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, যা এ ধরনের ঘটনাকে উৎসাহিত করছে। এগুলো কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একটা গণতান্ত্রিক সমাজে এমন উদাহরণ মেলে না। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

বিজ্ঞাপন
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন