default-image

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। তবে মূলত ২৫ মার্চ রাতেই অপারেশন সার্চলাইট নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সামরিক অভিযান শুরু করেছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। ২৫ মার্চ এক রাতেই হানাদার বাহিনী হত্যা করেছিল প্রায় ৫০ হাজার নিরস্ত্র মানুষকে। নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভয়াল সেই কালরাতকে স্মরণ করা হয়েছে।

জাতীয় গণহত্যা দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে গতকাল সকাল ১০টায় শহরের কেডি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল মামুন, নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম খান, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোবারুল ইসলাম প্রমুখ।

বিকেলে শহরের মুক্তির মোড় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদ নওগাঁর আয়োজনে দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা হয়। একুশে পরিষদের সভাপতি ডি এম আবদুল বারীর সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন একুশে পরিষদের উপদেষ্টা ওহিদুর রহমান, আতাউল হক সিদ্দিকী, শরিফুল ইসলাম খান প্রমুখ।

আলোচনা সভায় বক্তারা ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি জানান। তাঁরা বলেন, ২৫ মার্চ এক রাতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা করেছিল প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। আর মাত্র ৯ মাসে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে ওরা ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করেছে। এই বর্বর ঘটনা সভ্যতার মানচিত্রে সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দাবি রাখে। এ জন্য জাতিসংঘে এবং দেশে দেশে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।

আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় একুশে পরিষদের আয়োজনে আলোর মিছিল কর্মসূচি পালন করা হয়। সন্ধ্যা সাতটায় মুক্তির মোড় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে এই আলোর মিছিল শুরু হয়। এতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার কয়েক শ মানুষ অংশ নেয়।

এদিকে গতকাল সকাল ১০টার দিকে সিরাজগঞ্জ শহরের বাজার স্টেশন মুক্তির সোপান শহীদবেদিতে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্যে দিয়ে পদযাত্রা শুরু হয়। পরে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে গিয়ে শেষ হয়। সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলামের আহ্বানে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল কুমার দাস, মোস্তফা কামাল খান প্রমুখ।

পরে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সব শ্রেণি–পেশার মানুষের রক্ত দিয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাস সঠিকভাবে জানে না। তাদের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক সৃষ্টির জন্য সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি কাজ করছে।

রায়গঞ্জ উপজেলায় বেলা ১১টার দিকে উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউএনও মো. শামীমুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

জয়পুরহাটে মোমবাতি প্রজ্বালন, আলোচনা সভা ও মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং দুটি বধ্যভূমিতে পাঠাগারের উদ্বোধন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে জয়পুরহাট সদর উপজেলার পাগলা দেওয়ান ও একই উপজেলার কড়ই কাদিরপুর গ্রামের বধ্য ভূমিতে মোমবাতি প্রজ্বালন ও পাঠাগারের উদ্বোধন করা হয়। এ দুই বধ্যভূমিতে সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগ এবং জেলা প্রশসানের সহযোগিতায় পাঠাগারের উদ্বোধন করা হয়। কড়ই কাদিরপুর বধ্যভূমিতে পাঠাগারের উদ্বোধনের পর সেখানে সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালানো হয়। জেলা প্রশাসক মো. জাকির হোসেন পাঠাগার ও মোমবাতি প্রজ্বালনের উদ্বোধন করেন।

সদর উপজেলার ওপর বধ্যভূমি পাগলা দেওয়ানে পাঠাগারের উদ্বোধন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মনিরুজ্জামান। সন্ধ্যায় সেখানেও মোমবাতি জ্বালানো হয়।

গতকাল সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় বগুড়া শহরের ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ এবং পাশের বগুড়া জিলা স্কুলা মাঠে দাঁড়ানো হাজারো মানুষের হাতে হাতে মোমবাতি জ্বালানো হয়। লাখো প্রদীপ জ্বালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাল বগুড়াবাসী। মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং স্বশস্ত্র প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অবদানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে বগুড়া জেলাজুড়ে ‘লাখো শহীদ স্মরণে, লাখো প্রদীপ জ্বালো’ শীর্ষক এই কর্মসূচির আয়োজন করে জেলা পুলিশ, জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল।

জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘জেলা শহরের বড় দুটি মাঠ ছাড়াও ১২ উপজেলায় লাখো মানুষ একযোগে লাখো প্রদীপ জ্বেলে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।’

শাজাহানপুর উপজেলা পরিষদ চত্বর, শেরপুর উপজেলা পরিষদ চত্বর, ধুনট এনইউ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠ, গাবতলী পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠ, সারিয়াকান্দি পাবলিক মাঠ, শিবগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি স্তম্ভ চত্বর, সোনাতলা শেখ রাসেল স্টেডিয়াম, দুপচাঁচিয়া সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠ, আদমদীঘি আইপিজে স্কুলমাঠ, নন্দীগ্রাম মনসুর হোসেন ডিগ্রি কলেজমাঠ এবং কাহালু মডেল স্কুল মাঠে ও সারিয়াকান্দি পাবলিক মাঠে লাখো শহীদ স্মরণে লাখো প্রদীপ জ্বালো কর্মসূচি পালন করা হয়।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া এবং প্রতিনিধি, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ]

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন