default-image

ঝুমকা থেকে সীতাহার। মাথার টায়রা থেকে পায়ের নূপুর। ঘরে ঘরে হরেক গয়না তৈরিতে ব্যস্ত কারিগরেরা। রুপা, তামা, পিতলসহ নানা উপকরণ থেকে তৈরি হয় এসব গয়না। প্রায় ২০টি গ্রামজুড়ে চলে গয়না তৈরির এই কর্মযজ্ঞ। এসব গ্রাম এখন ‘গয়নাপল্লি’ হিসেবে পরিচিত। বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকার গয়না তৈরি হয় এসব গ্রামে।

বগুড়া শহরের উপকণ্ঠ ধরমপুর বাজার ঘিরে গড়ে উঠেছে এই গয়নাপল্লি। এই গয়নাপল্লি গড়ে উঠেছে শহরতলির ধরমপুর, বারপুর, ঝোপগাড়ি, ছোট কুমিড়া, কালিবালা, মাটিডালি, জয়পুরপাড়া, আটাপাড়া, ফুলবাড়ি, শাখারিয়া, দশটিকা, ঘোলাগাড়ি, কৃষ্ণপুর ইসলামপুর, মরাকাটা, কুকরুল, রজাকপুর, অন্তাহার, মগলিশপুর, শিকারপুর ও দারিয়াল গ্রাম নিয়ে। এসব গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ গয়না তৈরির কাজে যুক্ত। গয়না তৈরির কারখানা আছে ১৭০টি।

এই পল্লির গয়না যায় সারা দেশে। তামা-রুপাকে ছাঁচে ফেলে গয়না তৈরি করে নিজেদের জীবনকেও বদলে ফেলেছেন কারিগরেরা। গয়না যায় রাজধানীর নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, গাউছিয়া ছাড়াও অভিজাত বিপণিবিতানে। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় এসব গয়নার বাজার তৈরি হয়েছে। ধরমপুরেই গড়ে উঠেছে গয়নার দেড় শর বেশি বিক্রয়কেন্দ্র (শোরুম)।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই ধরমপুর এলাকার মানুষ গয়না তৈরি পেশায় জড়িত। আগে তাঁরা সোনার গয়না বানাতেন। ধীরে ধীরে রুপা, তামা ও পিতলের গয়না গড়ার দিকে ঝোঁকেন।

দত্তবাড়ী থেকে উপশহর পার হয়েই সড়কের পাশে ধরমপুর বাজার। এখান থেকেই গয়নাপল্লি শুরু। ধরমপুর বাজারে সড়কের দুই পাশে সারি সারি গয়নার কারখানা ও বিক্রয়কেন্দ্র। কারখানার হাপরে জ্বলা আগুনে গলানো হচ্ছিল রুপা, তামা। এরপর ডাইস মেশিনে কেটে তা নেওয়া হয় মোম কাঠে। কারিগরেরা মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেন গয়না। নকশার কাজ করতে দেখা যায় নারীদের।

কারিগর ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানকার তৈরি গয়নার মধ্যে রয়েছে টায়রা, দুল, নোলক, সীতাহার, ব্রেসলেট, বিছা, শাড়িমালা, টিকলি, চূড় ও নূপুর। কারিগরেরা মূলত গয়না গড়ে দেন। মসৃণ ও রঙের কাজ করা হয় বগুড়ার বিসিক শিল্পনগরী এবং রাজধানীর তাঁতীবাজারে। নকশাসহ ফরমাশ দিলে কারিগরেরা গয়না বানিয়ে দেন।

তামা, রুপার এই গয়না প্রথম তৈরি শুরু করেন প্রয়াত মোজাম্মেল হক। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন রইচ উদ্দিনসহ কয়েকজন। প্রথম দিকে এখানকার তৈরি গয়না স্থানীয়ভাবে বিক্রি হতো। পরে মোজাম্মেল হকের সঙ্গে রমজান আলী সর্দারসহ (৭০) কয়েকজন এর বাণিজ্যিক প্রসার ঘটান। রমজান আলী সর্দার কারিগর থেকে এখন কারখানার মালিক হয়েছেন।

গয়না তৈরি ও বিক্রয়কারী ব্যবসায়ীদের নিয়ে ধরমপুর বাজারে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সমিতি। ধরমপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, করোনার আগেও প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ টাকার গয়না তৈরি ও বিক্রি হয়েছে। সেই হিসাবে বছরে এখানকার গয়নার বাজার বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। করোনার আগে ঈদ, নববর্ষ ও বিয়ের মৌসুমে প্রতিদিন গয়নার বেচাবিক্রি হয়েছে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার। স্বর্ণের দাম দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় তামা-রুপার গয়নার কদর বাড়ছে।

ব্যবসায়ী ও কারিগরেরা বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে টানা প্রায় তিন মাস গয়না তৈরি ও বিক্রি বন্ধ থাকে। এখনো গয়না তৈরি ও বিক্রির কাজ স্বাভাবিক হয়নি। এখন প্রতিদিন গড়ে পাঁচ লাখ টাকার গয়না বিক্রি হচ্ছে। গয়নার বেচাবিক্রি কমে যাওয়ায় কারিগরদের আয়ও কমেছে।

ধরমপুরের একটি বাড়ির বারান্দায় বসে তামা ও পিতলের গয়না সীতাহারে নকশা করছিলেন নিলুফা বেগম (৩২)। তিনি বলেন, ‘আগে সংসারত অভাব আচলো। বেকার সয়ামি (স্বামী)। ঠিকমতো প্যাটভরে ভাতও জুটাপার পারিনি। ছয় বছর ধরে গয়না বানাচ্চি। এ কাজ করে মাসে কামাই করিচ্চি গড়ে ১২ হাজার টেকা। সয়ামিও বাজারের এক কারখানাত কাম করিচ্চে।’

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বগুড়া কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলাম বলেন, বিসিক থেকে আধুনিক নকশা তৈরি ও উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ আছে। উদ্যোক্তারা ঋণসহায়তাও পেতে পারেন।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন