বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম মাহবুবুর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মতিউর রহমানের পরিবারের সদস্যরা যখন আবেদন করেছিলেন, তখন আমি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি ছিলাম না। আমি ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর এমডি হিসেবে যোগদান করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মতিউর রহমানের পরিবারের সদস্যরা পুনরায় উপযুক্ত কাগজপত্রসহ আমার বরাবর আবেদন করলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব।’

মতিউর রহমানের পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে। বর্তমানে তাঁর পরিবার লালমনিরহাট শহরের বঙ্গবন্ধু কলোনি–সংলগ্ন এলাকায় বাস করে।

সহযোদ্ধা ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মতিউর রহমান ঢাকায় বেবিট্যাক্সি চালাতেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২১-২২ বছর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতের আগরতলায় গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁকে নৌ কমান্ডোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৫-১৬ আগস্ট মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষিত নৌ কমান্ডোরা পূর্ব পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দর ও প্রধান প্রধান নদীবন্দরে একযোগে আক্রমণ চালায়, যা ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামে খ্যাত। এ অপারেশনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি পাকিস্তানসহ বিশ্বকে হতভম্ব করে দেয়। পৃথিবীর প্রায় সব প্রচারমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করে। এই অপারেশনে সহ–দলনেতা মতিউর রহমান অংশ নেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি ফেরিঘাট আক্রমণে। তাঁদের দলনেতা ছিলেন শাহজাহান সিদ্দিকী (বীর বিক্রম)। পরবর্তী সময়ে মতিউর রহমান বরিশাল বন্দর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি অপারেশন করেন।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার তাঁকে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সর্বোচ্চ ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। এর আগে থেকেই তাঁর খোঁজ ছিল না। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তৎকালীন কর্মকর্তা আবদুল হান্নান ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ১৯৯৮ সালে তাঁর ঠিকানা খুঁজে পান। কিন্তু এর দুই বছর আগে ১৯৯৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিনি লালমনিরহাট শহরের বাসায় মারা যান। লালমনিরহাট শহরের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর দুই স্ত্রীর চার ছেলে, দুই মেয়ে এবং দ্বিতীয় স্ত্রীকে রেখে তিনি মারা যান।

মতিউর রহমান জেনে যেতে পারেননি, তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা। এই বিয়োগান্ত ঘটনা নিয়ে ২০১১ সালের ২ আগস্ট প্রথম আলোতে ‘জেনে যেতে পারলেন না তিনি বীর উত্তম’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পর ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় আসেন মতিউর রহমান। সেখান থেকে দুই বছর পর লালমনিরহাট শহরে এসে বসবাস শুরু করেন। কুমিল্লার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর লালমনিরহাটের আদিতমারীর খাতাপাড়া গ্রামের বাবর আলীর মেয়ে আমেনা বেগমকে বিয়ে করেন। যোগ দেন আনসার ব্যাটালিয়নে সৈনিক হিসেবে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মতিউর রহমান প্রথমে পরিবার নিয়ে লালমনিরহাটের সাহেবপাড়ার রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমিতে অস্থায়ী নির্মিত ছোট একটি ঘরে বাস করতেন। আমৃত্যু তিনি সেখানে ছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে লালমনিরহাট শহরের বঙ্গবন্ধু কলোনি–সংলগ্ন এলাকায় জনতা ব্যাংক লিমিটেড পাঁচ শতক জমি কিনে দিয়ে সেই জমিতে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করে দেয়। ২০১১ সালের ১২ জুলাই মতিউর রহমানের পরিবারের কাছে বাড়িটি হস্তান্তর করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

মতিউর রহমানের স্ত্রী আমেনা বেগম বলেন, আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্য হিসেবে চাকরি করে অনেক কষ্টে সংসার চালাতেন তাঁর স্বামী। তিনি বেঁচে থাকতে জেনে যেতে পারেননি, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য রাষ্ট্র তাঁকে বীর উত্তম খেতাব দিয়েছে। তিনি অনেক হতাশা ও দুঃখ–কষ্ট নিয়ে চলে যান। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘সরকার বীর উত্তমদের যে সম্মানী ভাতা দিচ্ছে, তা বেঁচে থাকতে পাব কি না জানি না। বেকার ছেলে নিয়ে ভীষণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।’

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ লালমনিরহাট ইউনিট কমান্ডের সাবেক অধিনায়ক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বীর উত্তমের জন্য নির্ধারিত সম্মানী ভাতা পাওয়ার জন্য মতিউর রহমানের পরিবারের সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে বলেছি। ওরা যোগাযোগ করেছে বলে শুনেছি। এত দিনেও এ সমস্যার সমাধান না হওয়াটা দুঃখজনক।’

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, বীর উত্তম মতিউর রহমানের পরিবারের সদস্যরা যাতে রাষ্ট্রের দেওয়া উপযুক্ত সম্মানী ভাতার টাকা পান, সে জন্য প্রশাসনিকভাবে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন