default-image

দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়া, দলীয় কোন্দল, নেতা-কর্মীদের বিভক্তি আর একে অপরকে ‘অবিশ্বাস’ করার কারণে নীলফামারীর জলঢাকা আর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে। নির্বাচন শেষে এমন আলোচনা দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে। প্রার্থীরাও অভিযোগ তুলেছেন মুখে পাশে আছি বললেও নেতা-কর্মীরা মূলত কাজ করেছেন অন্যের হয়ে।

নির্বাচনে দুটি পৌরসভাতেই জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। জলঢাকায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর ভোটসংখ্যা এতটাই কম যে তিনি জামানত হারিয়েছেন। আর গোবিন্দগঞ্জে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর চেয়ে দলীয় প্রার্থীর ভোট কম ছয় হাজারের বেশি।

পরাজয়ের কারণ হিসেবে জলঢাকায় পরাজিত প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক মো. মোহসীন বলেছেন, দলে একে অপরের প্রতি ‘বিশ্বাস’ নেই। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দিনের বেলায় তাঁর পক্ষে প্রচার চালালেও রাতে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছেন। ‘তাঁরা কেউ আমাকে বলেছেন, পূর্ব দিকে যাও, কেউ বলেছেন, না, পশ্চিমে যাও।’ মূলত দলীয় কোন্দল আর অবিশ্বাসের কারণেই নৌকার ভরাডুবি হয়েছে।

একই বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জে পরাজিত প্রার্থী ও উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভোটের মাঠে নেতা-কর্মীরা ৫ শতাংশ কাজও করেননি। জেলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভোটের আগে কোনো ভূমিকাই রাখেননি।

বিজ্ঞাপন

জলঢাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজয়ের পেছনে যে ‘অবিশ্বাস’–এর কথা বলেছেন, তা দীর্ঘদিন কমিটি না থাকার কারণেই গড়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন নেতা-কর্মীরা। পৌর আওয়ামী লীগের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দীক বলেন, ২০০৪ সালে জলঢাকা উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হয়। এরপরের ১৭ বছরে আর কোনো কাউন্সিল হয়নি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁদের মতো করে সংগঠন চালাচ্ছেন। এ কারণে নেতা-কর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না। একই অবস্থা অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোরও।

নেতা-কর্মীরা বলেন, গত ১৭ বছরের মধ্যে ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন গোলাম মোস্তফা। তখনো তাঁর বিপক্ষেও দলের একটি পক্ষের অবস্থান ছিল। এই বিভক্তির কারণেই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী তৈরি হয়েছে। ২০১৫ সালের পৌরসভা ও সবশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরই ধারাবাহিকতা ছিল পৌরসভা নির্বাচনেও।

নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ইলিয়াস হোসেন উপজেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি। তিনি ভোট পেয়েছেন ১৪ হাজার ৭৯৮টি। বিপরীতে দলীয় প্রার্থী মো. মোহসীন পান মাত্র ৭৬৫ ভোট।

দলে একে অপরের প্রতি ‘বিশ্বাস’ নেই। কেউ আমাকে বলেছেন, পূর্ব দিকে যাও, কেউ বলেছেন, না, পশ্চিমে যাও। কোন্দল আর অবিশ্বাসের কারণেই নৌকার ভরাডুবি হয়েছে।
মো. মোহসীন, আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রার্থী সিলেকশনে ভুল ছিল। ইলিয়াস হোসেনের নাম ১ নম্বরে রেখে তিনজনের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কিন্তু ইলিয়াস হোসেন আগের নির্বাচনেও বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। কেন্দ্র তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি। মনোনয়ন দেয় মো. মোহসীনকে। কিন্তু মো. মোহসীনের জনসম্পৃক্ততা ছিল না।’

এদিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে উপজেলা আওয়ামী লীগের সবশেষ কাউন্সিল হয় ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ। তিন বছর মেয়াদের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় দুই বছর হতে চলল। পৌরসভায় দলীয় মনোনয়ন পান উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আতাউর রহমান বলেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের একত্র করতে সমন্বয়ের অভাব ছিল। ফলে নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ গোপনে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন।

বিজ্ঞাপন

ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সহসভাপতি মুকিতুর রহমান পান ১১ হাজার ১৪৯ ভোট। তৃতীয় স্থান পাওয়া দলীয় প্রার্থী জাহাঙ্গীরের ভোট ৫ হাজার ৩৯। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, একই দলের দুজন প্রার্থী হলে ভোট ভাগাভাগি হওয়াটা স্বাভাবিক। সমস্যা হলো বেশির ভাগই গেছে ‘বিদ্রোহী’র পক্ষে। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফের ভাগনে জাহাঙ্গীর আলম। দলে একই পরিবারের স্বজনদের হাতে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হওয়ার শঙ্কাটাও পরাজয়ের কারণ।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন