নূর মোহাম্মদের আইনজীবী এজাজুল হক বলেন, পাঁচজনের বেশি লোক সংঘবব্ধ হয়ে কোনো অপরাধ করলে সেটা বেআইনি জনতা সংঘবদ্ধ হয়ে করা অপরাধের ধারায় পড়ে। ঘটনার দিন ২৪ থেকে ২৫ জন লোক নূর মোহাম্মদের ওপর হামলা ও তাঁর গবেষণা প্লট তছনছ করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ এই ধারায় অপরাধের প্রমাণ পায়নি উল্লেখ করে মাত্র তিনজনের নামে অভিযোগপত্র দিয়েছে। এটাই আপত্তির মূল বিষয়।

এজাজুল হক বলেন, অভিযোগপত্র জমা পড়ার পর আদালত মামলার বাদীর কাছে চিঠির মাধ্যমে জানতে চান, তিনি এই অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট কি না। গতকাল রোববার জবাব দেওয়ার দিন ধার্য ছিল। এই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করা হবে। এই জন্য বাদী সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। আগামী ধার্য তারিখে বাদী নারাজিপত্র জমা দেবেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, তানোর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওহাবের নির্দেশে কৃষিবিজ্ঞানীকে মারধর করে তাঁর গবেষণা প্লটের ধান নষ্ট করা হয়েছে। এতে তাঁর ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে পুলিশের জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে ১৫ হাজার টাকা ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ক্ষতির বিষয়টি তিনি যা পেয়েছেন, তাই দিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনের পেছনে কত খরচ হয়, সেটা তিনি জানেন না।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গোল্লাপাড়া গ্রামে সোমবার বিকেল সাড়ে চারটায় স্থানীয় অঞ্জন মালাকারের (৪৫) জমির ধান কাটা হচ্ছিল। সেখানে টিটু নামের চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন সরদারের নেতৃত্বে ২৪–২৫ জন শ্রমিক ধান কাটার কাজ করছিলেন। পাশে নূর মোহাম্মদের গবেষণা প্লটের ছোট ছোট অংশে বিভিন্ন জাতের ধান ছিল। এর মধ্যে কিছু ধান কাটা ছিল, কিছু এখনো কাটা হয়নি। তাঁরা নূর মোহাম্মদের গবেষণা প্লটের ৬২ জাতের কাটা ধান একত্র করে এবং জমির খাড়া ধান নষ্ট করে ট্রলি পার করছিলেন।

এ সময় তিনি বাধা দিতে গেলে সেখানে উপস্থিত যুবলীগ নেতা আবদুল ওহাব (৩৮) হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমরা পুলিশের ভয় করি না। তোর যা করার তুই কর।’ অঞ্জন মালাকার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোর কোন বাপ আছে, ডেকে নিয়ে আয়। আমরা তোর জমির ওপর দিয়েই ধানের ট্রলি পার করব।’

তদন্ত কর্মকর্তা শুধু আবদুল ওহাব, কৃষক শ্রী অঞ্জন মালাকার ও টিটু নামের শ্রমিক সরদারের নামে অভিযোগপত্র দিয়েছেন। পেনাল কোডের ১৪৩/৩৪১ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরায় বেআইনি জনতা সংঘবদ্ধ হয়ে অপরাধ সংঘটিত করার বিষয় রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. নূরুল মতিন গত ১৬ নভেম্বর প্রথম আলোর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, একটি নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য সরকার ৭ থেকে ৯ লাখ টাকা ব্যয় করে থাকে।

সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে নূর মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ১০ বছর ধরে এই গবেষণা প্লটে ৬২টি নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন। এ জন্য তিনি ১৫ লাখ টাকা ক্ষতির দাবি করেছেন। সরকারি ব্যয়ের তুলনায় তিনি খুব কম করে ধরেই ১৫ লাখ টাকা ক্ষতির কথা বলেছেন। অথচ তদন্ত কর্মকর্তা তার ধারেকাছেও যাননি।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (বর্তমানে নাটোর সদর থানায় কর্মরত) উপপরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ভয়ে অনেকেই মামলার সাক্ষ্য দিতে চাচ্ছিল না। তিনি সাক্ষীদের বুঝিয়েছেন বিজ্ঞানী নূর মোহাম্মদ দেশের সম্পদ। তাঁর গবেষণা প্লট তছনছ করে জাতীয় ক্ষতি করা হয়েছে। তারপর সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। এজাহার নামীয় তিন আসামি ছাড়া অন্যদের নাম–ঠিকানা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তদন্তকালে পাঁচজনের বেশি লোক অপরাধ সংঘটিত করেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ জন্য পেনাল কোডের ১৪৩/৩৪১ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ক্ষতির বিষয়টি তিনি যা পেয়েছেন, তাই দিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনের পেছনে কত খরচ হয়, সেটা তিনি জানেন না।

নূর মোহাম্মদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো সনদ নেই, তবে আছে ধান নিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবন। এ পর্যন্ত সংকরায়ণের পর নূর মোহাম্মদের কৌলিক সারির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই শতাধিক। এগুলোর মধ্যে চার-পাঁচটি ধান জাত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি খরাসহিষ্ণু, সুগন্ধি ও স্বল্পজীবনকালের ধান উদ্ভাবন করেছেন। কৃষি উৎপাদনে সাফল্যের জন্য নূর মোহাম্মদ ২০০৫ সালে পান রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক। সেরা কৃষি উদ্ভাবন ক্যাটাগরিতে তীর-প্রথম আলো কৃষি পুরস্কার-২০১৮ পেয়েছেন এই কৃষিবিজ্ঞানী।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন