ঘূর্ণিঝড় অশনি আঘাত হানলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, এ নিয়ে শঙ্কায় আছেন তাঁরা।
আশ্রয়শিবিরের একটি পাহাড়ের ঢালুতে ৮ ফুট প্রস্থ ও ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য একটি ত্রিপলের ঘরে স্ত্রী ও সাত ছেলেমেয়ে নিয়ে বসতি গেড়েছেন রোহিঙ্গা পঞ্চাশোর্ধ্ব সৈয়দ করিম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৭ সালে মে মাসে আঘাত হেনেছিল একটি ঘূর্ণিঝড়, তখন পাহাড়ধসে কয়েক শ রোহিঙ্গাবসতি বিলীন হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় অশনি আঘাত হানলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে, কারণ পাঁচ বছর আগে তৈরি ত্রিপলের বসতিগুলোর তেমন সংস্কার হয়নি। বসতিগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

পাশের লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরটি গড়ে উঠেছে কয়েকটি পাহাড়ের ঢালুতে। একটি পাহাড়ের ঢালুতে ত্রিপলের ছাউনিতে আছেন রোহিঙ্গা নারী আলমরিজান বেগম। সংসারে তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। আলমরিজান বলেন, কিশোরী দুই মেয়েসহ ছোট্ট ত্রিপলের ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ে ঘরটি বিলীন হলে মেয়েদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। আশ্রয়শিবিরের অভ্যন্তরে যেসব শেল্টার আছে, সেগুলোয় থাকার পরিবেশ নেই। কিশোরী মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রায়ই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাঁকে।

উখিয়ার মধুরছড়া, জুমশিয়া, কুতুপালং ও থাইংখালী আশ্রয়শিবিরগুলোয় ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্কে রয়েছে লাখো রোহিঙ্গা। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ। মধুরছড়া আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা) জামাল আহমদ বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পড়লে রোহিঙ্গাদের বসতি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলা হচ্ছে। কিন্তু ঘরে মালামাল রেখে কোনো রোহিঙ্গা পাহাড়ের নিচে—কয়েক কিলোমিটার দূরের টিনের ছাউনি ও বাঁশের বেড়ার শেল্টারে (স্কুল-মাদ্রাসা ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র) যেতে আগ্রহী নয়। কারণ, শেল্টারে থাকার পরিবেশ নেই।

তা ছাড়া যেসব ঘরে সন্তানসম্ভবা, বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ লোকজন রয়েছেন, তাঁদের পাহাড়ের বসতি থেকে নিচে নামানো-ওঠানো খুবই কঠিন কাজ। হাঁটা রাস্তা ছাড়া যানবাহন চলাচলের কোনো ব্যবস্থাও নেই অধিকাংশ আশ্রয়শিবিরে। ৬ থেকে ৭ নম্বর সতর্কসংকেত পড়লে ক্যাম্পের ৯০ শতাংশ বসতির ত্রিপলে ছাউনি এমনিতে উপড়ে পড়বে। তখন বৃষ্টির পানিতে ভিজতে হবে শরণার্থীদের।

বালুখালী ও কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গানেতা জাকির হোসেন ও মোহাম্মদ আলম বলেন, ঘূর্ণিঝড় অশনি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, রেডক্রস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন এনজিওর কর্মী বাহিনীর সঙ্গে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীকেও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে ঘূর্ণিঝড়ে ভারী বর্ষণ হলে পাহাড়ধসে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাবসতি বিলীনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উখিয়ার ২১টি আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছে অন্তত ৯০ হাজার রোহিঙ্গা। এসব আশ্রয়শিবিরে বসতি ৯ লাখের বেশি রোহিঙ্গার। অন্যদিকে, টেকনাফের ১৩টি আশ্রয়শিবিরে রয়েছে আড়াই লাখের বেশি রোহিঙ্গা।

আশ্রয়শিবিরগুলোয় ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব শাহ রেজওয়ান হায়াত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, ক্যাম্পে ক্যাম্পে চলছে মাইকিং। ঘরে ঘরে গিয়েও ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের সচেতন করা হচ্ছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল নিশানা ওড়ানো হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবল ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে বলে জানায় আবহাওয়া অফিস।

সকাল থেকে কক্সবাজারে সাগর উপকূল প্রচণ্ড উত্তাল রয়েছে। কক্সবাজার শহর, উখিয়া, মহেশখালী—কোথাও কোথাও দমকা হাওয়াসহ হালকা বৃষ্টি হলেও অন্যান্য এলাকায় তীব্র গরম পড়ছে। ঝড়টি যেকোনো সময় গতি বদলে বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের দিকেও মুখ করে এগোতে পারে। দেশের প্রধান তিন বন্দর চট্টগ্রাম, পায়রা ও মোংলা এবং কক্সবাজার উপকূলকে ২ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌযানগুলোকে সাবধানে ও উপকূলের কাছাকাছি স্থানে চলাচল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন