default-image

জামালপুরের সরিষাবাড়ীর যমুনা সার কারখানার আশপাশের মানুষ গত ২৯ বছর ধরে ভুগছে অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাবে। বছরে দুবার কারখানা থেকে অ্যামোনিয়া গ্যাস ছেড়ে দেওয়া হয়। অ্যামোনিয়ার প্রভাবে প্রতিবছর ১ হাজার ১২৫ বিঘা জমিতে চাষ হচ্ছে না। কারখানার আশপাশের জলাশয়গুলোর মাছও মরে যাচ্ছে। পোষা প্রাণীগুলোও রোগে ভুগছে, মরেও যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুদের ওপর অ্যামোনিয়ার প্রভাব মারাত্মক। শিশুদের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস ছাড়ার সময় ৭ থেকে ৩০ তিন পর্যন্ত ছুটি দিয়ে দেওয়া হয় স্কুল-কলেজগুলোও।

অ্যামোনিয়ার এই সমস্যা সমাধানের উপায় কর্তৃপক্ষের জানাও আছে। তবে তা ২৯ বছরেও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ওই কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মঈনুল হক বলেন, অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সময় কিছুটা বাইরে চলে যায়। এত বড় কারখানা, আশপাশে একটু ক্ষতি তো হবেই। অ্যামোনিয়া গ্যাস শোধনাগারের জন্য কারখানার তিন একর জমিতে লেগুন নির্মাণ করা হবে। লেগুন নির্মাণ করা হলেই ফসল, গাছপালা নষ্ট হবে না। পরিবেশেরও ক্ষতি হবে না। লেগুন নির্মাণের কাগজপত্র শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে পাস হয়ে জামালপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আছে। ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেই লেগুন নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘যমুনা সার কারখানা কোম্পানি লিমিটেড’ উপজেলার পোগলদিঘা ইউনিয়নের তারাকান্দিতে অবস্থিত। ১৯৯১ সালে এই কারখানায় সার উৎপাদন শুরু হয়। ২৯ বছর ধরেই ৬ মাস পরপর কারখানায় উপজাত হিসেবে উৎপন্ন হওয়া অ্যামোনিয়া গ্যাস ছেড়ে দেওয়া হয়। তখন কারখানার পার্শ্ববর্তী কান্দারপাড়া, তারাকান্দি, চরপাড়া, পলিশা, পাখিমারা, ডুরিয়ারভিটা গ্রামে টেকা দায় হয়ে ওঠে।

পোগলদিঘা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামস উদ্দিন জানান, কারখানার গ্যাসে ৫টি গ্রামের ১১ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। গ্যাস বন্ধ বা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের দাবি দীর্ঘদিনের।

বিজ্ঞাপন

কান্দারপাড়া গ্রামের আম্বিয়া বেগম বলেন, ‘যহন গ্যাস ছাড়ে, তহন আর বাড়িত থাকা যায় না, দৌড়ায়া বাড়িত্থন পলাইতে হয়। তহন চোক্ষে দেহি না, ছোট বাচ্চাদের রোগবালাই লাইগাই রইছে। আম-কাঁঠালগাছে ফল ধরে না। আমার দুইডা গরুও মরছে।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শাহেদুর রহমান জানান, অ্যামোনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা হচ্ছে। ফুসফুস আক্রান্ত হচ্ছে। চোখ জ্বালাপোড়া করে। মৃত্যুও হতে পারে। শিশুদের বিকাশে অ্যামোনিয়ার প্রভাব খুব নেতিবাচক।

কারখানার পাশেই পোগলদিঘা উচ্চবিদ্যালয়, পোগলদিঘা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, পোগলদিঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কান্দারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। পোগলদিঘা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান জানায়, যখন গ্যাস ছাড়া হয়, তখন ক্লাসে থাকা যায় না, অনেকেরই শ্বাসকষ্ট হয়।

পোগলদিঘা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরওয়ার হোসেন বলেন, কারখানা থেকে গ্যাস ছাড়লে বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই চলছে। গ্যাস বন্ধের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেও কোনো কাজ হয়নি। জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে কখনো দুই মাস, কখনো কখনো দুই সপ্তাহ বিদ্যালয় ছুটি রাখতে হয়।

ডুরিয়ারপাড় গ্রামের বাসিন্দা ও পোগলদিঘা ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এছাহাক আলী বলেন, কারখানার গ্যাসের জন্য ২৯ বছর ধরে তাঁর ছয় বিঘা জমিতে ফসল হয় না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গ্যাসের জন্য প্রতিবছর ১ হাজার ১২৫ বিঘা জমি অনাবাদি থাকে।

উৎপাদনের সময় কিছুটা বাইরে চলে যায়। এত বড় কারখানা, আশপাশে একটু ক্ষতি তো হবেই।
মোহাম্মদ মঈনুল হক, যমুনা সার কারখানার মহাব্যবস্থাপক

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী ২৯ বছরে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বরাবরে দফায় দফায় ক্ষতির জন্য আবেদন করেছেন, কোনো কাজ হয়নি। চরপাড়া গ্রামের মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘কারখানার গ্যাসের কারণে আমরা জমিতে ফসল আবাদ করলেও ফসল হয় না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা গ্যাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছি। গ্রামের মানুষ এখন অসহায় হয়ে পড়েছে।’

গ্যাস ছেড়ে দেওয়া হলে নদী ও পুকুরের মাছ মরে যায় বলে জানান উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘কারখানার আশপাশের পুকুরগুলোতে মাছ চাষ করলেও মরে যায়। গ্যাস ছেড়ে দেওয়া হলে কারখানার উত্তরে ১৫ কিলোমিটার দূরের শাখানদীগুলোতে মাছ ও জলজ প্রাণী মরে ভেসে ওঠে।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শুনেছি কারখানা থেকে অ্যামোনিয়া ছেড়ে দেওয়ার পর গৃহপালিত পশুপাখি অ্যামোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হলে পশুপাখি মারা যায়।’

তবে এসব নিয়ে উপজেলা প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তরের তেমন মাথাব্যথা নেই। জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিহাব উদ্দিন আহমদ জানান, অভিযোগ পেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আর পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের পরিচালক ফরিদ আহম্মেদ জানান, এলাকাবাসী একটা অভিযোগ দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর প্রধান কার্যালয় ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন