default-image

তপ্ত রোদে একটানা ধান কাটার পর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তাঁরা দুজন। মেতে ওঠেন খুনসুটি আর নানা গল্পে। তবে তাঁদের গল্পের গোটাটাই জুড়ে ছিল ধান ও ধানের দাম নিয়ে। মজুর কার্তিক বর্মণ বলছিলেন, ‘ধানের বাজার শুধু বাড়িছে, আর বাড়িছে।’ তাঁর সঙ্গী আতাউর রহমান বললেন, ‘তাই তো দেখছু। কাল হাটত হাইব্রিড ধান গেইছে ১৯০০ টাকা বস্তা (দুই মণ)। জন্মেও হাইব্রিড মোটা ধানের এমন দাম পাইনি।’ সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পূর্ব বেগুনবাড়ি এলাকায় ওই দুজনের সঙ্গে কথা হয়।

ওই এলাকার চাষি আনোয়ারুল হক জানালেন, গত কয়েক বছর হাইব্রিড জাতের আগাম ধান চাষ করে চাষি লোকসান গুনেছেন। গত বছর এই সময় প্রতি বস্তা ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি করতে পারেননি। এবার প্রায় দুই হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে। ধানের আবাদ করে চাষি লাভবান হচ্ছেন।
গত তিন-চার দিন সদর ও রানীশংকৈল উপজেলার কয়েকটি হাট ঘুরে জানা গেছে, হাটজুড়ে ধানের প্রচুর সরবরাহ। ভ্যান ও নছিমনে করে হাটে ধান বিক্রির জন্য আনছেন চাষি। আগাম আমন ধান প্রতি মণ ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সদর উপজেলার খোঁচাবাড়িহাটে ১০ মণ ধান বিক্রি করতে এসেছেন বেগুনবাড়ি গ্রামের চাষি হাসান আলী। তিনি জানান, এবার চার বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমিতে হালচাষ থেকে শুরু করে সার, কীটনাশক, সেচ ও কাটা-মাড়াই পর্যন্ত বিঘায় খরচ গড়ে প্রায় ৯ হাজার টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে ফলন হয়েছে ১৮ মণ। ৯৫০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৪০০ টাকা।

বিজ্ঞাপন
default-image

রানীশংকৈল উপজেলার রাতোর গ্রামের চাষি হায়দার আলী দুই বিঘা জমিতে আগাম আমন জাতের ধান আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে ধানের দাম এবারের মতো আর কখনো পাউনি। প্রতিবছর এমন দাম হইলে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বাঁচিবা থাকিতে পারিমো।’
ওই গ্রামের চাষি সনাতন রায় বলেন, ‘আমি সাধারণত আলু আবাদ করি। তাই বোরো আবাদের পর আলু চাষ করি। কয়েক বছর ধরে বোরো ও আলু চাষের মাঝে স্বল্পমেয়াদি হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ করে আসছি। এ বছর ধানের ভালো দাম পেয়েছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর ২৬ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের ধান আবাদ হয়েছে, যা মৌসুমে আমন আবাদের ১৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। জেলার কৃষকেরা এখন সেই ধান ঘরে তুলছেন।

গত বুধবার সদর উপজেলার গৌরীপুর, দৌলতপুর, জগন্নাথপুর ও উনত্রিশ মাইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা পাকা ধান কাটায় ব্যস্ত। কেউ কেউ আঁটি বাঁধছেন। কেউ আবার মাথায় করে ধানের আঁটি বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।
ধানের দাম বেশি পেলেও ফলন নিয়ে অনেক চাষির মধ্যে হতাশা রয়েছে। রানীশংকৈল উপজেলার ভরনিয়া গ্রামের চাষি কৃষ্ণ বর্মণ বলেন, এবার কারেন্ট পোকার আক্রমণ ও বিভিন্ন রোগবালাইয়ের কারণে ধানের ফলন কমে গেছে। কিন্তু বাজারে ধানের ভালো দাম সেই কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক আফতাব হোসেন বলেন, ধান চাষ করে চাষি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। এবার তাঁরা ধানের ভালো দাম পাচ্ছেন। কৃষকেরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পেলে ধানের আবাদ আরও বেড়ে যাবে, যা খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0