default-image

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তাঁর বাবা ওমর আলী শেখের (৭০) ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আজ শুক্রবার ভোররাতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) হাতে আটক হয়েছেন ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (৪২)। আটকের পর অতীতে তাঁর যত বেপরোয়া কর্মকাণ্ড, সব একে একে উঠে আসছে। এ ঘটনার পরপরই আজ দুপুরে কেন্দ্রীয় যুবলীগ থেকে জাহাঙ্গীর হোসেনকে বহিষ্কার করার কথা জানিয়েছেন দিনাজপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি মো. রাশেদ পারভেজ।

আটকের পর জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। এই হামলার ঘটনায় আজ ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে আসাদুল ইসলাম (৩৫) ও মাসুদ রানা (৪০) নামের যুবলীগের আরও দুজন নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। ঘোড়াঘাট উপজেলার ওসমানপুর সাগরপাড়া এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আসাদুল। তিনি দিনাজপুর জেলা যুবলীগের সদস্য। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিরামপুর, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট থানার পুলিশের একটি দল আজ ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে হাকিমপুর উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকায় বোনের বাসা থেকে আটক করে আসাদুলকে।

আর মাসুদ রানা ঘোড়াঘাটের ৩ নম্বর ওয়ার্ড সিংড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। তাঁর বাবার নাম গোলাম মোস্তফা। মাসুদ রানাকে নিজ এলাকা সিংড়া ইউনিয়ন থেকে আজ দুপুর ১২টার দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রংপুর নিয়ে যায় র‌্যাব।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া ঘটনার পর থেকেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক রয়েছেন ইউএনওর বাসভবনের নৈশ প্রহরী মো. পলাশ (২৬)। এ ছাড়া বেলা দুইটার দিকে উপজেলা চত্বরের সামনে থেকে রংমিস্ত্রি নবীরুল ইসলামকে (৩৮) তুলে নিয়ে যান র‍্যাব সদস্যরা। তাঁর বাড়ি উপজেলা-সংলগ্ন চক বামুনদিয়ার বিশ্বনাথপুর গ্রামে।

বিকেলে মো. রাশেদ পারভেজ প্রথম আলোকে জানান, ২০১৭ সাল থেকে জাহাঙ্গীর হোসেন ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগেও তাঁর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় সাংসদ তাঁকে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয় যুবলীগের কাছে সুপারিশ করেছিলেন। সর্বশেষ মুঠোফোনে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তাঁকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এখনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি হাতে পাওয়া যায়নি। আর যুবলীগের সদস্য আসাদুল ইসলাম ও মাসুদ রানাকে জেলা থেকে বহিষ্কার করার প্রক্রিয়া চলছে।

জাহাঙ্গীরের যত অপকর্ম

জাহাঙ্গীর ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ কষিগারি এলাকার আবুল কালামের ছেলে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল। আগে থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ২০১৭ সালে উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যুবলীগের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই জাহাঙ্গীর যুক্ত হয়ে পড়েন মাদক ব্যবসা ও জমি দখলের কাজে। তাঁর নেতৃত্বে উপজেলা যুবলীগের আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে মাদক সেবন ও মাদক বিক্রির সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘোড়াঘাট থানায় তাঁর নামে ৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মাদক মামলা। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৯ মে ঘোড়াঘাটের পৌর মেয়র আবদুস সাত্তার মিলন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ত্রাণ ও ইফতার সামগ্রী বিতরণ করতে গেলে উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে যুবলীগের নেতা মাসুদসহ কয়েকজন মেয়রের ওপর হামলা চালান।

পৌর মেয়র আবদুস সাত্তার মিলন জানান, তাঁর ওপর হামলার ঘটনার পরের দিন তিনি জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ ছাড়া জমি দখল ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের জড়িত থাকার কথাও জানান তিনি।

জাহাঙ্গীরের বিষয়ে দিনাজপুর-৬ (নবাবগঞ্জ-বিরামপুর-হাকিমপুর-ঘোড়াঘাট) আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ শিবলী সাদিক বলেন, ‘জাহাঙ্গীর বেপরোয়া টাইপের। কিছুদিন আগে আমার ওপরও হামলার চেষ্টা করেছিল।’

হাকিমপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, আটক করা দুজন মাদক সেবনকারী ও ব্যবসায়ী। তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় কয়েকটি মাদক মামলা রয়েছে। তবে কী কারণে ইউএনওর ওপর তাঁরা হামলা করেছেন, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

চায়ের দোকানে আলোচনা

এদিকে ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে স্থানীয় জনমনে চলছে ফিসফাস-আলোচনা-সমালোচনা। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের টহল অব্যাহত রয়েছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে প্রায় সব জায়গায় এখন একই আলোচনা। হামলার ঘটনার বিষয়ে নানা জনের নানা মত। দোকানের টেলিভিশনে খবর শুনতে জটলা বাড়ছে মানুষের।

কি সকাল, কি বিকেল, কিংবা রাত। ঘোড়াঘাট উপজেলার ওসমানপুর এলাকায় উপজেলা পরিষদের সামনে সব শ্রেণি-পেশার সব বয়সী মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। এটি প্রতিদিনের চেনা চিত্র। এমনকি করোনাভাইরাসের ভয় উপেক্ষা করে মুখ লুকিয়ে হলেও সকালে বাসা থেকে বের হওয়া চাইই চাই। উদ্দেশ্য, একটুখানি আড্ডা। বন্ধু কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে চায়ের কাপে চুমুক, আর নানা বিষয়ে আলোচনার ঝড় তোলা এসব লোকজনের যেন নিত্যকার কাজ।

বুধবার রাত শেষে বৃহস্পতিবার সকালটা এ রকমই হবে—এমনটাই প্রত্যাশা ছিল উপজেলাবাসীর। সকাল এসেছে ঠিকই, কিন্তু রক্তে রাঙানো সকাল। ঘুম ভেঙে তাঁরা শুনতে পেলেন, মধ্যরাতে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা উপজেলার অভিভাবক নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসায় হামলা চালিয়ে ইউএনও এবং তাঁর বৃদ্ধ পিতাকে কুপিয়ে জখম করেছে। মুহূর্তে থমকে যায় কাজকর্ম, নিস্তব্ধ হয় ঘোড়াঘাট।

বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজ কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজ শেষ করে সরকারি বাসভবন শাপলার দোতলায় ফেরেন ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানম। মধ্যরাতে তিনি ও তাঁর বাবা ওমর আলী (৭০) সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনা জানাজানি হলে বিছানায় রক্তাক্ত অবস্থায় সংজ্ঞাহীন পড়ে থাকা ইউএনওকে ঘোড়াঘাট থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং তারপর নেওয়া হয় ঢাকার আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে। রাতে তাঁর মাথায় সফল অস্ত্রোপচার হয়। বর্তমানে তিনি শঙ্কামুক্ত।

আজ সকালে ঘোড়াঘাট থানাসংলগ্ন পুরাতন বাজার এলাকায় মাছ ব্যবসায়ী আজাদ বলেন, বয়স হওয়ার পর থেকে এ রকম কোনো ঘটনা এই উপজেলায় ঘটেনি। যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীরের আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সে। তার নামে থানায় মামলাও আছে। কিছুদিন পূর্বে পৌরসভার মেয়রকেও মেরেছিল। তবে ইউএনওর ওপরে হামলা করবে, এমন সাহস কী করে হলো বুজে আসে না।’ এর পেছনে আরও কেউ থাকতে পারে বলে ধারণা তাঁর।

একই কথা বলেন উপজেলা পরিষদ এলাকার বাসিন্দা তোজাম আহমেদ (৫০)। তোজামের ধারণা, ‘এটি পরিকল্পিত ঘটনা। হত্যার উদ্দেশ্যেই এই ঘটনা ঘটেছে। তবে এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে।’

দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, যাঁদেরকে আটক করা হয়েছে, তাঁদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তবে নৈশপ্রহরীর কাছ থেকে কোনো প্রকার স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে এখনই বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। যত দ্রুত সম্ভব ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপরে হামলার পেছনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন